
রাজিবুল ইসলাম রাজিব
এক সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খুলনা ছিল সিনেমা হলের শহর। উল্লাসিনী, পিকচার প্যালেস, বৈকালি, সোসাইটি, স্টার কিংবা ঝিনুক—এসব নাম শুধু একটি স্থাপনার নয়, বরং একটি সময়ের, একটি আবেগের প্রতীক। পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল উৎসবের মতো আনন্দঘন অভিজ্ঞতা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।
হারিয়ে যাচ্ছে গৌরবময় অতীত
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় খুলনা জেলায় প্রায় ২০টি সিনেমা হল চালু থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র চারটি—চিত্রালী ডিজিটাল সিনেমা হল, লিবার্টি সিনেপ্লেক্স, সঙ্গীতা ও শঙ্খ। বাকি হলগুলোর অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গেছে বহু আগেই। কোথাও বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, আবার কোথাও পড়ে আছে জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত অবস্থায়।
বন্ধ হয়ে যাওয়া উল্লেখযোগ্য হলগুলোর মধ্যে রয়েছে—পিকচার প্যালেস, ঝিনুক, সোসাইটি, স্টার, মিনাক্ষী, বাসরী, সোহাগ, সুন্দরবন, শঙ্খমহল, জনতা, বৈকালি, উল্লাসিনী, গ্যারিসন, শাপলা ও রূপসাগর। অনেক হলই প্রায় দেড় দশক ধরে দর্শকশূন্য।
কেন বন্ধ হয়ে গেল সিনেমা হল?
সংশ্লিষ্টদের মতে, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে—
মানসম্মত বাংলা সিনেমার অভাব
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা
আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো
বিদ্যুৎ বিল ও পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি
এসব কারণে ধীরে ধীরে দর্শক হলমুখী হওয়া বন্ধ করে দেয়, ফলে ব্যবসায় ধস নামে।
জীবিকার সংকটে শ্রমজীবীরা
সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে এ খাতের শ্রমজীবী কর্মীদের ওপর। গেটম্যান, প্রজেকশনিস্ট, টিকিট বিক্রেতা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী—অনেকেই এখন পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।
স্টার সিনেমা হলের সাবেক অপারেটর সিরাজুল ইসলাম জানান, হল বন্ধ হওয়ার পর তিনি এখন ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অন্যদিকে মিনাক্ষী হলের সাবেক বুকিং ক্লার্ক নূর আলম বলেন, ২০০৮ সালের পর থেকেই ব্যবসায় ধস নামে, বর্তমানে ছোট ব্যবসা করে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন।
টিকে থাকার লড়াইয়ে শেষ আশ্রয়
বর্তমানে চালু থাকা হলগুলোর অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়। সঙ্গীতা সিনেমা হলের ব্যবস্থাপক জানান, আয় দিয়ে খরচই ওঠে না, যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিত্রালী ডিজিটাল সিনেমা হলের পরিচালক তপু খান বলেন, ভালো কনটেন্টের অভাব ও সরকারি সহায়তার ঘাটতির কারণে হল পরিচালনা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
হারাচ্ছে সাংস্কৃতিক পরিচয়
সিনেমা হল শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি একটি শহরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম দেশীয় সংস্কৃতি থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
উত্তরণের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন—
মানসম্মত বাংলা সিনেমা নির্মাণ বৃদ্ধি
পুরোনো হলগুলো আধুনিক সিনেপ্লেক্সে রূপান্তর
সরকারি প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা
একযোগে সারা দেশে সিনেমা মুক্তির ব্যবস্থা
সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে খুলনার সিনেমা হলগুলো কেবল স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কাই এখন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।





