
আলী কদর পলাশ
জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো এখন দেশের গণমাধ্যম স্বাধীনতা, বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৩৭টি মামলায় ২৬৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে ১৪ জন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মামলায় এখনো কারও জামিনে মুক্তি মেলেনি। অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়নি, বিচারিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।
দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর ভাষানটেক থানায় দায়ের করা জুলাই আন্দোলনের সময়ের এক হত্যা মামলায় গ্রেফতার হন। তার সঙ্গে একাত্তর টেলিভিশনের সিইও মোজাম্মেল হক বাবুসহ তিনজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্যামল দত্ত প্রায় ২০ মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন। তার স্ত্রী কনা দত্ত বিবিসিকে বলেছেন, “এটলিস্ট ঈদের আগে হলেও যাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমার বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়া পড়াশোনা করছে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এখনো ফ্রিজ থাকায় মেয়ের কাছে টাকাও পাঠাতে পারছি না।” এই বক্তব্য শুধু একজন বন্দির পরিবারের কষ্ট নয়, বিচার বিলম্বের মানবিক মূল্যও তুলে ধরে।
একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক হেড অব নিউজ শাকিল আহমেদ এবং সাবেক চিফ করেসপনডেন্ট ফারজানা রূপাকে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। পরদিন উত্তরা পূর্ব থানায় দায়ের করা ফজলুল করিম হত্যা মামলায় তাদের চার দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। পরে আদাবর থানায় দায়ের করা গার্মেন্টসকর্মী রুবেল হত্যা মামলায় আরও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তাদের কারাগারে পাঠায় আদালত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ১৫টি হত্যা মামলা রয়েছে। ১৩টি মামলায় জামিন শুনানি শেষ হওয়ার পর ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল আদেশ দেওয়ার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ সময় আবেদন করলে আদেশের তারিখ পিছিয়ে ১১ মে নির্ধারণ করে হাইকোর্ট।
এই মামলাগুলোর ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শাকিল আহমেদের পরিবারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য বিবিসিকে বলেছেন, “তাদের বিরুদ্ধে সবগুলাই জুলাইয়ের হত্যা মামলা। কোনোটা দুর্নীতি বা অন্য স্পেসিফিক কিছু নাই। কোনোটাতেই তারা এক নম্বর আসামি না। ১০ নম্বরের পরে বা ৩২, ৫৭, ১১১ এরকম।” তিনি আরও বলেন, “১৮ মাস হয়ে গেল এখনো দেয় নাই। এটা তো নিয়ম চার্জশিট দেওয়ার, না দিলে জামিন দিতে হবে।” এই অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না, যিনি নিজেও জুলাইয়ের ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি মামলার আসামি, বিবিসিকে বলেছেন, “এই প্রতিটি মামলার ধরন বা প্যাটার্ন প্রায় একই রকম। প্রত্যেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পাঁচটির বেশি করে মামলা দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ সময় নিয়ে পিছায়, আবার কোর্টের জুরিসডিকশন চেঞ্জ হয়, নতুন করে মামলা নিয়ে আরেক কোর্টে দৌড়াতে হয়, এটা একটা দুর্ভোগ। এখন ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা।” একজন আইনজীবীর এই বক্তব্য বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই পরিস্থিতি উদ্বেগ তৈরি করেছে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস সম্প্রতি মোজাম্মেল হক বাবু, শ্যামল দত্ত, ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদের মুক্তি দাবি করেছে। সিপিজের চিঠিতে বলা হয়েছে, নথিপত্র, স্বজনদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। কোনো অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়নি। সিপিজে আরও লিখেছে, “আটক রাখার ধরন দেখে মনে হয় মূলত সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তাদের এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে।”
এই অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা যথার্থই বলছেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ সুনির্দিষ্ট না হলে, তদন্ত অসম্পূর্ণ থাকলে এবং বিচার শুরু না হলে কাউকে মাসের পর মাস কারাগারে রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। মানবাধিকারকর্মী কাজী জাহেদ ইকবাল বিবিসিকে বলেছেন, “আইন যেন নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেবে, কিন্তু যাতে কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত না করা হয় এবং মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া না হয়। আইনের অবশ্যই নিরপেক্ষ, সুষ্ঠ এবং সৎ প্রয়োগ হতে হবে।”
নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতার সাংবাদিকদের জামিনের বিষয়ে সহযোগিতা চেয়েছে। নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বিবিসিকে বলেছেন, “আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছি, আমরা বলেছি যে, এটার সুরাহা হওয়া উচিত। তিনি তো বলছেন যে, আমরা সুরাহা করার চেষ্টা করবো, আপনারা আমাদের লিস্ট দেন।” তিনি আরও বলেছেন, “আমরা আশা করি যেহেতু পুরোনো মামলা, এই মামলাগুলো সরকার রিভিউ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।”
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং গণমাধ্যমের ভবিষ্যতের জন্য এই মামলাগুলোর দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জরুরি। সাংবাদিকের পেশাগত অবস্থান, রাজনৈতিক মত, অথবা অতীতের কোনো সম্পর্ক বিচারহীন আটক রাখার কারণ হতে পারে না। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, প্রমাণ থাকলে বিচার হবে, অপরাধ প্রমাণ হলে শাস্তি হবে। কিন্তু অভিযোগপত্র ছাড়া, বিচার ছাড়া, দীর্ঘ কারাবাস কোনোভাবেই আইনের শাসনের পরিচয় নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইনকে ন্যায়বিচারের বাহন করা, ভয়ের অস্ত্র নয়।





