
রংপুর প্রতিনিধি
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায় একটি মসজিদের প্রকৃত ইমামকে বাদ দিয়ে সরকার ঘোষিত ভাতা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এক স্থানীয় জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে। উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পলিখিয়ার জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে এ ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় মুসল্লি, মসজিদ কমিটি ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্তের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এলাকাবাসী। মসজিদ কমিটির সভাপতি ও চতরা আহমদিয়া মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত সুপারিন্টেন্ডেন্ট মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিক গত ২৯ মার্চ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সরকার ঘোষিত ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেমদের ভাতা কর্মসূচির আওতায় সংশ্লিষ্ট মসজিদের জন্য তালিকা প্রস্তুত করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, মসজিদের নিয়মিত দায়িত্ব পালনকারী ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমানের নাম রহস্যজনকভাবে বাদ পড়ে যায়। অন্যদিকে খাদেম ও মোয়াজ্জেমের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ইমামের স্থানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় কুতুবপুরইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি নয়ন মিয়ার নাম। অভিযোগ উঠেছে, তথ্য গোপন ও জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি ভাতার অর্থ আত্মসাৎ করছেন। মসজিদ কমিটির সভাপতি মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা যথাযথভাবে তালিকা প্রস্তুত করে জমা দিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের প্রকৃত ইমামের নামই ছিল। কিন্তু পরে দেখি, সেই নাম বাদ দিয়ে অন্য একজনের নাম ঢোকানো হয়েছে। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ও উদ্বেগজনক। তিনি আরও বলেন, ইমাম একটি সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল পদ। যিনি নিয়মিত নামাজ পরিচালনা করেন না, তার নাম কীভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়—এটি আমরা বুঝতে পারছি না। এ ঘটনার পর থেকে মসজিদে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক মুসল্লি ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই ব্যক্তির পেছনে নামাজ আদায় থেকেও বিরত রয়েছেন। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত ইমামের অধিকার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাই।
দক্ষিণ পলিখিয়ার জামে মসজিদের দীর্ঘদিনের ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, মসজিদ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আমি এখানে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। স্থানীয় মুসল্লিরা আমাকে জানেন এবং আমার পেছনে নামাজ আদায় করেন। কিন্তু হঠাৎ করেই আমার নাম বাদ দিয়ে অন্য একজন নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এতে আমি শুধু আর্থিকভাবেই নয়, সামাজিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তিনি বলেন,আমি প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চাই। প্রকৃত ইমাম হিসেবে আমার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং যারা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অভিযোগ অস্বীকার করে কুতুবপুর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি নয়ন মিয়া বলেন, মসজিদে কোনো স্থায়ী পেশ ইমাম ছিল না। স্থানীয়দের অনুরোধেই আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সবার সম্মতিতেই আমার নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যিনি অভিযোগ করেছেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সভাপতি নন। ব্যক্তিগত স্বার্থে তিনি এসব অভিযোগ করছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, যিনি বর্তমানে ইমাম হিসেবে দাবি করছেন, তিনি মূলত খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, পেশ ইমাম হিসেবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আঞ্জুমান সুলতানা বলেন, অভিযোগটি আমরা পেয়েছি এবং গুরুত্ব সহকারে দেখছি। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় মুসল্লিরা বলছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এ ধরনের অনিয়ম শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, বরং সামাজিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খলার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা জরুরি।
স্থানীয় একাধিক মুসল্লি জানান, আমরা চাই, যে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে ইমামতি করছেন, তার নামই তালিকায় থাকুক। অন্যায়ভাবে কেউ যেন সরকারি সুবিধা নিতে না পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি ভাতা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এর সুফল প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাবে না। তাই এ ধরনের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। দক্ষিণ পলিখিয়ার জামে মসজিদকে ঘিরে ইমামের ভাতা আত্মসাতের অভিযোগ এখন স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে প্রশাসনিক গুরুত্ব পেয়েছে। তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে এলাকাবাসী।





