
নিজস্ব প্রতিনিধি :
চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তিটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী। এই চুক্তির ফলে শুভঙ্করের ফাঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের অনুমোদিত এই প্রকল্প। জাতীয় স্বার্থবিরোধী হওয়ায় চুক্তি স্থগিতসহ ৩টি দাবিতে হাইকোর্টে রিট (পিটিশন নম্বর ৩০২১) করেছেন মো. জিয়াউল হক জিয়া নামে একজন আইনজীবী।
চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ডেনমার্কের একটি কোম্পানির সঙ্গে ১৭ নভেম্বর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর (এমওইউ) করে অন্তর্বর্তী সরকার। হাসিনা সরকারের নির্ধারিত ৩০০ মিলিয়ন ডলার প্রকল্পে ৫৫৬ মিলিয়ন ডলার (প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা) নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে। অতিরিক্ত প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হলেও কৌশতগতভাবে গোপন রয়েছে চুক্তিটি।
অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি অনুসারে, ডেনমার্কের এপি মোলার মায়ের্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া টার্মিনাল ৩৩ বছর পরিচালনা করবে। নির্মাণকাল তিন এবং ৩০ বছর অপারেশন মিলে ৩৩ বছরের চুক্তিটি এখন ৪৮ বছরের জন্য ‘কনসেশন চুক্তি’ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। মাত্র ১৫ দিন সময়ের ব্যবধানে সঠিক আইনিকাঠামো নির্মাণ ছাড়াই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। যাকে ‘কালোচুক্তি’ নামে অভিহিত করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে।
পিপিপি আইন ও ক্রয় নীতিমালার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন কেবল একটি নীতিগত সম্মতি কিন্তু শর্ত পূরণ না হলে চুক্তি বৈধ হয় না। অন্যদিকে শর্ত পূরণ হলে প্রকল্পকে আবার পিপিপি কমিটি ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয়। চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো সরকারি সংস্থা চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে না। তবুও এমওইউ সম্পন্ন করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ধাপগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
এই কালোচুক্তির মূলে আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক উপদেষ্টা লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়াল এডমিরাল এম এম মনিরুজ্জামান, বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ কিউএনএস অফডকের মালিক নুরুল কাইয়ুম খান এবং বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান মেরিন কমোডর ক্যাডেট আরিফ আহমেদ মোস্তফা। বিতর্কিত এই চুক্তির সুফল তুলতে যাচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় কিউএনএস কোম্পানির কর্ণধার নুরুল কাইয়ুম খান। যাকে এপিএমের স্থানীয় এজেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রকল্পটি প্রথমে তিন বছর নির্মাণ ও ২৭ বছর পরিচালনা করার পরিকল্পনা ছিল। পরে দীর্ঘমেয়াদে অর্থাৎ ৪৮ বছরের (তিন বছর নির্মাণ ও ৪৫ বছর পরিচালনা) জন্য কনসেশন চুক্তি করা হয়েছে। যেখানে দীর্ঘমেয়াদে বন্দরের আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়নি।
গোপন শর্তানুসারে, বছরে ৮ লাখ কনটেইনার পর্যন্ত প্রস্তাবিত মূল্য ১০.৫ ডলার, যা প্রতি টিউসে পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে আলোচনায় রয়েছে মাত্র ২১ ডলার হিসাবে। এরপর ৯ লাখ কনটেইনার থেকে প্রতি টিউসে বন্দর পাবে ১২ ডলার, যা আলোচনায় রয়েছে ২৩ ডলার হিসাবে। এখানে ৩১ ডলার হওয়া উচিত এবং ন্যায্য বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে প্রতি টিউসে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পাবে ১২৬ ডলার। অজানা কারণে এখানে বাংলাদেশ বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়েছে।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা বা চুক্তির আর্থিক ও কারিগরি বিশ্লেষণ জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। যাকে ঘিরে দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলে পরিচালনায় ডেনমার্কের এপি মোলার মায়ের্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে গত বছরের ১৭ নভেম্বর এই কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। একই দিনে শেখ হাসিনাসহ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজনের দণ্ড ঘোষণা করেন আদালত। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর নির্মাণ চুক্তির ব্যয় অতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি করে ধরা হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বা ৫২৫ মিলিয়ন ডলার। সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে ৪৮ বছরে জন্য ‘কনসেশন চুক্তি’ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
একই দিনে ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল (পিআইসিটি) পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ সুইজারল্যান্ডভিত্তিক লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান মেডলগ এসএ-এর সঙ্গে ২২ বছরের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিটি ১২১ কোটি টাকা আর্থিক মূল্যে চূড়ান্ত হয়েছে।





