
নিজস্ব প্রতিনিধি :
দেশের কর্পোরেট খাতের ডিজিটাল নিরাপত্তার এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে সুপারশপ চেইন স্বপ্ন’র ডাটাবেজে সাইবার হামলার ঘটনা। ২৯ মার্চ বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো সমাধান সামনে আসেনি। বরং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া, ডার্ক ওয়েবে বিপুল পরিমাণ তথ্য ফাঁসের দাবি, আর তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা মিলিয়ে ঘটনাটি এখন একটি বড় কর্পোরেট নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে।
স্বপ্ন’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির বলেন, হ্যাকাররা গত বছরের ডিসেম্বরেই কোম্পানির ওয়েবসাইট ও ডাটাবেজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা সিস্টেমে প্রবেশের পর প্রবেশাধিকার ফেরত দিতে ১৫ লাখ মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কোনো অনৈতিক সমঝোতায় রাজি হয়নি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটকে সঙ্গে নিয়ে তদন্তে কাজ করছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্বপ্ন’র ৪০ লাখের বেশি নিবন্ধিত গ্রাহক রয়েছে, ৬৩ জেলায় তাদের ৮১২টি আউটলেট আছে। ফাঁস হওয়া তথ্যে গ্রাহকের নাম, মোবাইল নম্বর, কেনাকাটার ইতিহাস এবং কিছু ক্ষেত্রে বিস্তারিত লেনদেন তথ্যও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার গুলশানের এক গ্রাহক বলেন, নিজের স্ত্রীর ফোন নম্বর দিয়ে খোঁজ করতেই সংশ্লিষ্ট রেকর্ড পাওয়া যায় এবং সেখানে নাম, কেনাকাটার ইতিহাস ও বিস্তারিত লেনদেন তথ্য দৃশ্যমান ছিল। তিনি বলেন, এটি কোনো তাত্ত্বিক ঝুঁকি নয়, বরং বাস্তব, ব্যক্তিগত এবং ইতোমধ্যেই প্রকাশিত।
ঘটনার টাইমলাইন আরও বেশি উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। এমডি সাব্বির হাসান নাসির বলেন, হ্যাকাররা আগস্ট ২০২৫-এ ইমেইলের মাধ্যমে প্রথম যোগাযোগ করে জানায় যে তারা ডাটাবেজে ঢুকেছে এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়ে ১৫ লাখ ডলার দাবি করে। পরে জিডি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯ আগস্ট ২০২৫ দুপুর ২টার দিকে এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের কম্পিউটারগুলো র্যানসমওয়্যারে লক হয়ে যায়। অর্থাৎ হামলার সূত্রপাত বহু আগে হলেও বিষয়টি বড় আকারে প্রকাশ্যে আসে মার্চের শেষ সপ্তাহে।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সাধারণ ডায়েরি করতে বিলম্ব। ২৮ মার্চ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় জিডি করেন এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের প্রশাসন ও সংকট ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. মাসুম বিল্লাহ। পুলিশ পরে নিশ্চিত করে যে জিডিটি ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। সাত মাস পর জিডি করার এই ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির সংকট ব্যবস্থাপনা, গ্রাহককে সময়মতো সতর্ক না করা এবং সামগ্রিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
জিডিতে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। সেখানে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী কিলিন র্যানসমওয়্যার সিন্ডিকেট এবং লকবিট ৫.০-সহ কয়েকটি গ্রুপ স্বপ্ন’র কর্মীদের লক্ষ্য করে ফিশিং ইমেইল পাঠায়। জিডি অনুযায়ী, স্বপ্ন’র এমআইএস টিম ম্যালওয়্যার অপসারণ করে সিস্টেম বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করলেও ১৭ মার্চ ২০২৬ হামলাকারীরা লকবিট ৫.০ পোর্টাল ব্যবহার করে ডার্ক ওয়েবে ৪১০ জিবির বেশি তথ্য ফাঁস করে। ফাঁস হওয়া ফাইলের মধ্যে ছিল গ্রাহকের নাম, ফোন নম্বর, ক্রয় ইতিহাস, সরবরাহকারীর তথ্য, চুক্তিপত্র, দৈনিক বিক্রির রেকর্ড, ব্যাংক জমার তথ্য, এইচআর ডকুমেন্ট এবং অভ্যন্তরীণ নীতিমালা।
ইউএনবি সূত্রে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অন্তত ২০২৫ সালে স্বপ্নে কেনাকাটা করা গ্রাহকদের নাম, ফোন নম্বর ও কেনাকাটার ইতিহাস ছড়িয়ে পড়ে। একই প্রতিবেদনে স্বপ্ন কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের সতর্ক করে জানায়, অচেনা বা সন্দেহজনক নম্বর থেকে আসা কল বা বার্তায় ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য না দিতে, এবং যাচাইহীন লিংকে ক্লিক না করতে। কোম্পানিটি আরও জানায়, তারা কখনো ফোনে পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চায় না। এই সতর্কতা থেকেই স্পষ্ট, তথ্য ফাঁসের প্রভাব এখনো বর্তমান এবং গ্রাহকদের ওপর ঝুঁকি অব্যাহত আছে।
স্বপ্ন’র এই ডাটাবেজ হ্যাক কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সাইবার হামলার খবর নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, গ্রাহকের তথ্য এখন কর্পোরেট ব্যবসায়িক সম্পদ হলেও তার সুরক্ষায় ব্যর্থতা কত দ্রুত জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হতে পারে। ১৩ দিন পেরিয়েও যখন আক্রান্ত গ্রাহকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব, তথ্য অপসারণের নিশ্চয়তা কিংবা দৃশ্যমান সমাধান সামনে আসে না, তখন প্রশ্ন জোরালো হয় একটাই দেশের বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় প্রস্তুত?





