
আলী কদর পলাশ
দেশের রাজনীতি আবারও এক অস্বস্তিকর মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর বাস্তবায়ন ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা এখন শুধু দলীয় তর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে। সরকার একদিকে সংস্কারের কথা বলছে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে ক্ষমতা ধরে রাখার পথই খোঁজা হচ্ছে। এই দ্বন্দ্ব যত দীর্ঘ হবে ততই বাড়বে অনিশ্চয়তা।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো আস্থার সংকট। সরকার যা করছে তা নিয়ে বিরোধীদের সন্দেহ গভীর। বিরোধীরা যা বলছে তা নিয়েও সরকারের ভরসা নেই। ফলে জাতীয় প্রয়োজনের বিষয়ও রাজনৈতিক অবিশ্বাসের দেয়ালে আটকে যাচ্ছে। এই পরিবেশে কোনো বড় সংস্কার টেকসই হয় না। কারণ সংস্কারের শক্তি আসে জনসম্মতি থেকে। শুধু প্রশাসনিক আদেশ থেকে নয়।
বিরোধী দলগুলোর বক্তব্য একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তারা বলছে কাঠামোগত পরিবর্তন পিছিয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণমুখী ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হচ্ছে। যদি এই অভিযোগের ভেতরে সামান্য সত্যও থাকে তবে তা উদ্বেগের। কারণ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার মূল কাজ হলো পথ তৈরি করা। পথ আটকে রাখা নয়। মানুষের ভোটে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তা দমন করলে হতাশা জন্ম নেবে। আর হতাশা থেকে অস্থিরতা তৈরি হবে।
আবার এটিও সত্য যে সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও স্পষ্ট হতে হবে। বিএনপি বলছে তারা সংস্কারের বিরুদ্ধে নয়। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংস্কার চায়। এই বক্তব্য ইতিবাচক। কিন্তু শুধু বক্তব্য যথেষ্ট নয়। জনগণ এখন স্পষ্ট রূপরেখা চায়। কোন ধারা বদলাবে। কীভাবে বদলাবে। কত সময়ের মধ্যে বদলাবে। সে বিষয়ে পরিষ্কার অঙ্গীকার দরকার। কারণ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাজনীতিতে শব্দের চেয়ে কাজ কম দেখা গেছে।
জামায়াতে ইসলামী এবং ১১ দলীয় জোটের হুঁশিয়ারিও সহজভাবে নেওয়ার বিষয় নয়। তারা বলছে জনরায় অবজ্ঞা করা হলে রাজপথে জবাব দেওয়া হবে। গণআন্দোলন গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু রাজপথের সংঘাত কখনো রাষ্ট্র মেরামতের একমাত্র ভাষা হতে পারে না। আন্দোলনের হুমকি তখনই বাড়ে যখন আলোচনার টেবিল দুর্বল হয়। কাজেই প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক সংলাপ কোথায়। জাতীয় ঐকমত্য গঠনের উদ্যোগ কোথায়।
এই মুহূর্তে দেশের দরকার উত্তেজনা নয়। দরকার খোলামেলা ব্যাখ্যা। সরকারকে পরিষ্কার বলতে হবে কোন অধ্যাদেশ কেন আনা হয়েছে। কোনটি বহাল থাকবে। কোনটি বাতিল হবে। কী প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিরোধীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সব কিছুতেই ষড়যন্ত্র দেখলে চলবে না। সত্যিকারের সংস্কার চাইলে প্রস্তাব নিয়ে সামনে আসতে হবে।
জুলাই চেতনা কিংবা গণভোটের ম্যান্ডেট কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি জনগণের প্রত্যাশার প্রতীক। সেই প্রত্যাশা হলো জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র। ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতা কাঠামো। অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি। যদি সরকার এই লক্ষ্য থেকে সরে যায় তবে সমালোচনা অনিবার্য। আবার যদি বিরোধীরা কেবল চাপ সৃষ্টির রাজনীতি করে তবে তারাও জনগণের আস্থা হারাবে।
রাষ্ট্রের এই সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে প্রয়োজন সংবিধান ও প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সৎ আলোচনা। ক্ষমতার প্রশ্নকে নয়। আমরা অনেকবার দেখেছি সুযোগ হারালে সংকট আরও গভীর হয়। এবার সেই ভুল করা চলবে না। সরকারকে স্বচ্ছ হতে হবে। বিরোধীদের দায়িত্বশীল হতে হবে। আর জাতীয় স্বার্থকে দলীয় কৌশলের ওপরে তুলতে হবে।
জনগণ এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা প্রমাণ চায়। তাই সময় এসেছে সন্দেহ নয় আস্থা গড়ার। মুখোমুখি নয় সমঝোতার। নিয়ন্ত্রণ নয় সংস্কারের। দেশের রাজনীতি সেই পথেই এগোবে বলে মানুষ এখনও আশা করে।





