
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বে হামের প্রকোপ বাড়ার সমান্তরালে বাংলাদেশেও পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গত ১৫ মার্চের পর থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান সামনে আসছে, তা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজার ছুঁইছুঁই, যার মধ্যে চার হাজারেরও বেশি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। সরকারি ও উপসর্গভিত্তিক হিসাব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার চিত্রও বেশ আশঙ্কাজনক। একদিনেই প্রায় আটশ শিশু লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে এবং নতুন করে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়, রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ল্যাব পরীক্ষায় এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ৮২৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এই সংকটে একা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের ১৭৯টি দেশে ৫ লাখেরও বেশি মানুষের মধ্যে হামের লক্ষণ পাওয়া গেছে। আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতেও টিকাদানের ঘাটতির কারণে সংক্রমণ বাড়ছে, যাকে প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন একটি ‘বিপদ সংকেত’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চ মৃত্যুঝুঁকি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া এবং নির্ধারিত ক্যাম্পেইনগুলোতে বিলম্বের কারণেই আজকের এই বিস্তার। সাধারণত কোনো জনপদে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা না গেলে এমন সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দেশের দুর্গম এলাকা, বস্তি অঞ্চল এবং যেখানে টিকাদানের হার কম, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শিশুদের তীব্র জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে। হাম প্রতিরোধে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে এমআর (MR) টিকার দুটি ডোজ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে, যেখানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সংক্রমণ রুখতে টিকাবঞ্চিত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে মাঠপর্যায়ে শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।





