
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহের শেষপ্রান্তে এসে আরও জটিল মোড় নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা একই সঙ্গে বেড়েছে। শুক্রবার এ বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরবর্তী লক্ষ্য বলে হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরান বলেছে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে না।
৩ এপ্রিলের আপডেটে দেখা যাচ্ছে হরমুজ প্রণালি এখন কেবল একটি নৌপথ নয়। এটি পরিণত হয়েছে চলমান যুদ্ধের কেন্দ্রীয় কৌশলগত অক্ষে। কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলার পর নিরাপত্তা পরিষদে যে প্রস্তাব উঠছে তাতে অন্তত ছয় মাসের জন্য হরমুজ দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে সদস্য দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরিষদের বর্তমান ঘূর্ণায়মান সভাপতি বাহরাইন এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছে।
শুরুতে প্রস্তাবটি জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের অধীনে ছিল। সে অবস্থায় তা সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথ খুলে দিতে পারত। তবে রাশিয়া ও চীনের আপত্তিতে সেই অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। তবু প্রস্তাবের ভাষা নিয়ে বেইজিং ও মস্কোর উদ্বেগ থাকায় ভেটোর আশঙ্কা এখনও রয়েছে।
এ অবস্থায় হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলে কিছুটা গতি ফেরার খবর দিয়েছে সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড। তাদের তথ্য অনুযায়ী টানা তৃতীয় দিনের মতো ওই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বেড়েছে। বুধবার ১৬টি জাহাজ পার হয়েছে। সব জাহাজই লারাক দ্বীপ ব্যবহার করেছে। সংস্থাটি বলছে আরও বেশি দেশ ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যাচ্ছে। এতে সামনে চলাচল আরও বাড়তে পারে। তবে এই সংখ্যা এখনও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। যুদ্ধ শুরুর আগে দিনে গড়ে ১৩০টি যান চলাচল করত।
কূটনৈতিক তৎপরতার এই সময়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ট্রাম্পের বক্তব্য। তিনি বলেছেন ইরানে যা অবশিষ্ট আছে তা ধ্বংস করা এখনো শুরুই করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তার দাবি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এখন পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে সেতু এবং তারপর বিদ্যুৎকেন্দ্র বেছে নেবে। ট্রাম্প আরও বলেছেন নতুন শাসনব্যবস্থার নেতৃত্ব জানে কী করতে হবে এবং তা দ্রুত করতে হবে।
এর আগে তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে নির্মাণাধীন একটি সেতুতে বিমান হামলায় আটজন নিহত এবং প্রায় একশ জন আহত হওয়ার খবর এসেছে। এই হামলার পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তিনি বলেছেন অসমাপ্ত সেতুসহ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা ইরানিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে না। তার ভাষায় এ ধরনের আঘাত কেবল এক বিপর্যস্ত শত্রুর পরাজয় ও নৈতিক পতনের বার্তা দেয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন এর ফলে আমেরিকার মর্যাদার যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনোই পুনরুদ্ধার হবে না।
৩ এপ্রিলের সারসংক্ষেপে আরও দেখা যাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্তার কমেনি। তেহরান ও কারাজে হামলা হয়েছে। ইস্পাহানে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতেও বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর রয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ও ইয়েমেন থেকে ইসরায়েলে নতুন হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। কাতার ও কুয়েত ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শনাক্তের কথা জানিয়েছে।
এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের আশঙ্কায় তেলের দাম বাড়ছেই। ফলে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে ৩ এপ্রিলের পরিস্থিতি বলছে, একদিকে জাতিসংঘ কূটনৈতিক পথ খোলা রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ময়দানে যুদ্ধের ভাষা আরও কঠোর হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি তাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ফ্রন্ট। এখানে যে সিদ্ধান্ত হবে, তার প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে।





