
এলিন মাহবুব
ঈদের আগের রাতটা আমার জন্য ঘুমহীন ছিল। ছোট্ট আমি, নতুন জামাটা বালিশের পাশে রেখে শুয়ে থাকতাম—বারবার হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতাম, যেন স্বপ্ন নয়, সত্যি। মা বারবার বলতেন, “ঘুমাও, না হলে কাল উঠতে পারবে না।” কিন্তু চোখে কি আর ঘুম আসত? মনে হতো, রাতটা যেন খুব ধীরে যাচ্ছে।
ফজরের আগেই উঠে পড়তাম। রান্নাঘরে ঢুকে মাকে জড়িয়ে ধরতাম—গরম সেমাইয়ের গন্ধে পুরো ঘর ভরে থাকত। নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে মনে হতো, আজ আমি অন্য কেউ খুব বিশেষ কেউ।
নামাজ পড়া শেষে সবার বাড়ি ফিরে আসা শুরু হতো তখন সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত ছিল ইদি।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম, কিন্তু চোখ দুটো সবসময় বড়দের হাতের দিকে। কখন কে ডাকবে—“এই, ইদি নাও।”
হাতের তালুতে যখন নতুন নোটটা পড়ত, মনে হতো যেন পুরো পৃথিবীটা আমার হয়ে গেছে।কিন্তু আজ, বড় হয়ে যখন নিজের চারপাশের শিশুদের দেখি, তখন মনে হয়—তাদের ঈদটা যেন অন্যরকম। অনেক বেশি ঝকঝকে, কিন্তু কোথাও যেন একটু ফাঁকা।
আমার কাছে ঈদের আনন্দ ছিল অনুভবের। নতুন জামার সুঘ্রাণ নেওয়া, চাঁদ রাতে মেহেদি লাগানোর সেই মিষ্টি প্রতিযোগিতা, আর সকালে নতুন জামা পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে খুশি হওয়া হওয়া—এটুকুই ছিল যথেষ্ট।
এখনকার শিশুদের কাছে ঈদ মানেই এক ডিজিটাল প্রোডাকশন। আয়নার চেয়ে মোবাইলের স্ক্রিন তাদের বেশি টানে। জামাটা পরে কেমন লাগছে, তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো ছবিতে কেমন আসবে। লেন্সের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ‘পোজ’ ঠিক করা আর ফিল্টার দিয়ে নিজেকে নিখুঁত করার চেষ্টায় ঈদের আসল সহজ আনন্দটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
ঈদের দিন বড়দের সালাম করে পাওয়া সেই নোটগুলো গুনে গুনে রাখা ছিল এক পরম প্রাপ্তি। সেই টাকা দিয়ে কী কেনা হবে—মালাই বরফ না কি খেলনা —তা নিয়ে চলত জল্পনা-কল্পনা।
এখনকার অনেক শিশুর কাছে ইদির চেয়েও দামী হলো তার স্মার্টফোনটি। সে টাকা গুনতে যতটা না আগ্রহী, তার চেয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত থাকে সেই মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করতে। হাত খরচ হিসেবে নগদ টাকার চেয়ে ডিজিটাল ওয়ালেটে বা গেমিং ক্রেডিট হিসেবে ইদি পাওয়াও এখন বিচিত্র কিছু নয়।
আমাদের ঈদ মানেই ছিল দলবেঁধে পাড়া বেড়ানো। কারো বাসায় যাওয়ার জন্য আগে থেকে অনুমতির প্রয়োজন হতো না; শুধু দরজায় নক করা আর এক চিলতে হাসিতেই সব খুশি ভাগ হয়ে যেত। বন্ধুর হাতে হাত রেখে অলিগলিতে দৌড়ানোই ছিল সামাজিকতা।
বর্তমান শিশুরা একই জায়গায় বসে থাকলেও প্রত্যেকে নিজের নিজের ডিজিটাল জগতে বিচরণ করে। তারা কথা বলে কম, চ্যাট করে বেশি। সরাসরি কারো চোখে চোখ রেখে হাসার বদলে তারা রিয়্যাক্ট বা ইমোজিতে অনুভূতি প্রকাশে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ‘একসাথে থাকা’ মানে এখন আর শারীরিক উপস্থিতি নয়, বরং একই গ্রুপ চ্যাটে সক্রিয় থাকা।
শৈশবের ঈদের স্মৃতিগুলো ছিল অমলিন। সেই দিনগুলোর গন্ধ, বাতাসের ঝাপটা আর আড্ডার শব্দগুলো আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে।এখনকার শিশুদের কাছে সব স্মৃতি ডিজিটাল স্টোরেজে। হাজার হাজার ছবি আর ভিডিওর ভিড়ে তারা আসল মুহূর্তটাই হয়তো উপভোগ করতে ভুলে যাচ্ছে। কয়েক বছর পর সেই স্মৃতিগুলো হার্ডড্রাইভ বা ক্লাউডে থেকে যাবে ঠিকই, কিন্তু মনের কোণে সেই শিহরণ জাগাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।
নব্বইয়ের দশকের ঈদ ছিল ‘অংশগ্রহণের’, আর বর্তমানের ঈদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘উপস্থাপনের’। সেই সময় আমরা উৎসবকে যাপন করতাম, আর এখনকার শিশুরা উৎসবকে উদযাপন করে অন্যদের দেখানোর জন্য। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের যোগাযোগ সহজ করেছে সত্য, কিন্তু সেই নিবিড় প্রাণের ছোঁয়াটা কোথাও যেন ম্লান হয়ে গেছে।
আমি যখন এই পরিবর্তনগুলো দেখি, তখন আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে।আমি কি ভাগ্যবতী ছিলাম, নাকি তারা ভাগ্যবান?
আমাদের কাছে ছিল না এত কিছু—কিন্তু আমরা একা ছিলাম না।তাদের কাছে আছে সবকিছু—কিন্তু তারা অনেক সময় একা।একজন নারী হিসেবে আমি জানি, শৈশবের এই স্মৃতিগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুরা যখন মানুষের চেয়ে ডিভাইসের সঙ্গে বেশি সময় কাটায়, তখন তাদের অনুভূতির জগৎও বদলে যায়। তারা কম প্রকাশ করে, কম মেশে, কম অনুভব করে।ঈদের মতো একটা উৎসব, যেখানে তারা শিখতে পারত ভালোবাসা, সম্মান, ভাগাভাগি—সেটা যদি শুধু একটা “কনটেন্ট ” হয়ে যায়, তাহলে সেই শেখাটা কোথায় যাবে?
আমি জানি, সময় বদলাবে। প্রযুক্তি আসবে, আরও উন্নত হবে।আমরা চাই বা না চাই, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই বাস্তবতাতেই বড় হবে। একজন মানুষ হিসেবে, আমার একটা ইচ্ছে আছে—তারা যেন অন্তত কিছুটা সেই ঈদ পায়, যেটা আমি পেয়েছিলাম।আমরা কি কিছু ফিরিয়ে আনতে পারি?হয়তো পুরোটা না, কিন্তু কিছুটা তো পারি।আমরা যদি তাদের নিয়ে বাইরে যাই,তাদের বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে দিই,তাদের হাতে শুধু ডিভাইস নয়, মানুষের হাতও তুলে দিই—তাহলে হয়তো তারা বুঝবে, ঈদ শুধু দেখা যায় না—ঈদ অনুভব করা যায়।
আমি এখনো সেই ছোট্ট মেয়েটাকে মনে করতে পারি—যে ঈদের সকালে নতুন জামা পরে দৌড়ে বেড়াত,যে ইদি পেয়ে লুকিয়ে রাখত,যে হাসত, কাঁদত, আর সত্যি সত্যি বাঁচত।আজকের অনেক শিশুরা হয়তো তার মতো নয়।কিন্তু তারা যদি একবার সেই অনুভূতিটা পায়—তাহলে হয়তো আবার ফিরে আসবে সেই পুরোনো প্রশ্নটা—“ইদি দিবেন?”আর সেই প্রশ্নের ভেতরে থাকবে—একটা সম্পর্ক, একটা স্মৃতি,আর এক টুকরো সত্যিকারের ঈদ।





