
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানকে দীর্ঘদিন ধরেই ঘিরে রেখেছে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। তবু থেমে নেই তেহরানের সামরিক শক্তি। কখনও আত্মঘাতী ড্রোন, কখনও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। একের পর এক প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলকে চাপে রাখছে ইরান। প্রশ্ন উঠছে, এত অর্থ আসে কোথা থেকে?
বিশ্লেষকদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইরানের বিশাল এক ‘ছায়া অর্থনীতি’-তে। মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই গোপন অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার বা তারও বেশি।
এই অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনিকে। তাঁর নেতৃত্বে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি ধীরে ধীরে গড়ে তোলে এক বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রি, গোপন কোম্পানি, হাওয়ালা লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই অর্থ প্রবাহ চলতে থাকে।
ইতিহাস বলছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তখনই বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই সময় থেকেই ছায়া অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের অর্থনীতির বড় অংশই নির্ভর করে তেল ও গ্যাসের উপর। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে স্বাভাবিক বাজারে তেল বিক্রি করা সহজ নয়। তাই বিকল্প পথ খুঁজে নেয় তেহরান। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী জাহাজ ব্যবহার করে গোপনে তেল রপ্তানি করা হয়। কখনও রাসায়নিক মিশিয়ে তেলের উৎসও বদলে দেওয়া হয়।
চীনের সঙ্গেও ইরানের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অনেক সময় ডলারের বদলে ইউয়ান মুদ্রায় তেল কেনাবেচা হয়েছে। এতে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ প্রবাহ চালু রাখা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হয়।
শুধু তেল নয়, ক্রিপ্টো মুদ্রা থেকেও বিপুল অর্থ আয় করেছে ইরান। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই খাত থেকে প্রায় ৭৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। এই অর্থের একটি অংশ অস্ত্র কেনা এবং সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ছায়া অর্থনীতি অনেকটা অক্টোপাসের মতো। বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের সঙ্গে এর নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে আছে। রাশিয়া, চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস এবং ইয়েমেনের হুথি এই তিনটি গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গোষ্ঠীর অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের পেছনেও তেহরানের ভূমিকা রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সবসময় অস্বীকার করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, ছায়া অর্থনীতির অনেক কথাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তবু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের সামরিক শক্তি ভেঙে পড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে প্রশ্নটা এখন আরও বড় হয়ে উঠছে এই গোপন অর্থনৈতিক শক্তিই কি ইরানের প্রকৃত বল?
ভবিষ্যতের সংঘাতে সেই উত্তরই হয়তো বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ নির্ধারণ করবে।





