মন্ত্রীদের শপথ বর্জন করে কি পুরোনো পথেই হাঁটলো বিরোধী দল?

Date:

spot_img

বিশেষ প্রতিনিধি

মঙ্গলবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই অনুষ্ঠানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদেরও শপথ হয়। কিন্তু সেখানে অনুপস্থিত ছিল জামায়াতে ইসলামী ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। নতুন সংসদের প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের এই অনুপস্থিতি রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

ঘটনাটি আরও তাৎপর্য পেয়েছে এই কারণে যে, শপথের কয়েক ঘণ্টা আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। অর্থাৎ বিরোধী দলের নেতৃত্ব ঠিক হওয়ার পরই প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত আসে। অনেকের চোখে এটি বাংলাদেশের পরিচিত রাজনৈতিক আচরণ। সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলেই ‘বর্জন-বয়কট’ সামনে চলে আসে। আবার কেউ বলছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা স্বস্তিকর হলো না।

তবে জামায়াত বলছে, এটি পুরোনো সংস্কৃতি নয়। এটি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ। জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানান, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ বিএনপি না নেওয়ায় প্রতিবাদ হিসেবে তারা শপথ অনুষ্ঠানে যাননি। তাদের ভাষায়, জুলাই সনদ নিয়ে যে অঙ্গীকার ছিল, বিএনপি শুরুতেই সেখান থেকে সরে এসেছে। তাই অনুষ্ঠান বর্জন তাদের কাছে প্রতিবাদের বার্তা।

বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানও এক বিবৃতিতে বলেন, গণতন্ত্র কোনো একদিনের বিষয় নয়। এটি দীর্ঘ যাত্রা। তিনি দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দল থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। অর্থাৎ তারা নিজেদের অবস্থানকে বর্জন নয়, প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

দিনটির ঘটনাপ্রবাহও আছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর জামায়াত জোট থেকে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করলে পরিস্থিতি কিছুটা নরম হয়। তখন অনেকের ধারণা ছিল, শপথ অনুষ্ঠানে বিরোধী দলও থাকবে। কিন্তু সকালে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপির এমপিরা শপথ না নেওয়ায় জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে ক্ষোভ বাড়ে। পরে তারা দুই ধরনের শপথই নিলেও, নিজেদের সংসদীয় দলের বৈঠকে শপথ অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বৈঠকেই বিরোধী দলীয় নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়।

এখানেই উঠছে পুরোনো সংস্কৃতির প্রসঙ্গ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, বাংলাদেশের সংসদ ইতিহাসে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করা এবং বিরোধী দলের ওয়াকআউট, বর্জন, পদত্যাগ এসব নতুন নয়। কেউ কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এক সময় ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’-এর তকমাও চালু ছিল। আবার কার্যকর বিরোধী দল গড়ার সুযোগ তৈরি হলেও তা ধরে রাখা যায়নি। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্র বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ব্যত্যয়ে ভুগছে। এক পক্ষের শপথে অন্য পক্ষ না যাওয়া—বাংলাদেশে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এবারও সেই ধারাবাহিকতা দেখা যাওয়ায় সংসদীয় রাজনীতির নতুন শুরুর বার্তাটা ম্লান হলো। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুমও ঘটনাটিকে দুর্ভাগ্যজনক বলেছেন। তবে তিনি আশা রাখছেন, এটি স্থায়ী হবে না। সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, সামনে বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার সুযোগ আসবে। তখনই বোঝা যাবে তারা সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে।

সব মিলিয়ে, শপথ অনুষ্ঠান বর্জন এখন দুইভাবে দেখা হচ্ছে। একদিকে, এটি প্রতিবাদের তাৎক্ষণিক ভাষা। অন্যদিকে, এটি পুরোনো বর্জন রাজনীতির পরিচিত পথ। নতুন সংসদের প্রথম দিনেই এই টানাপড়েন ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংসদের ভেতরে সহাবস্থানের পরীক্ষাটা শুরু হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বিরোধিতা কি সংসদের ভেতরে দায়িত্বশীল প্রতিযোগিতায় বদলাবে, নাকি আবারও বর্জন-ওয়াকআউটের পুরোনো চক্র ঘুরে ফিরে আসবে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...