তারেকের সঙ্গে আলোচনায় আপত্তি নেই জয়ের

Date:

spot_img

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, ১২ তারিখের নির্বাচনকে তিনি স্বীকৃতি দিতে রাজি নন। তবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে তার আপত্তি নেই।

জয় বলেন, “আমি সবসময়ই উন্মুক্ত। আমি এমন একজন মানুষ, যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করে। তা যত কঠিনই হোক, বা যার সঙ্গেই হোক। এটাই আমার কৌশল। জীবনে সবসময়ই এভাবেই চলেছি।”

গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন চলার সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয়ের সাক্ষাৎকার নেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভির সাংবাদিক মাহাথির পাশা। বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করে আইটিভি।

সাক্ষাৎকারে চব্বিশের আন্দোলন দমন, আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার দায়, সরকারের ‘ভুল’, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়, দেশে ফেরার সম্ভাবনা, নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান, আওয়ামী লীগের সংস্কারসহ নানা বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন জয়।

জয় এবারের নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “দেশের সবচেয়ে বড় দল এবং সব প্রগতিশীল দলকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। এমনভাবে নির্বাচন সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী তাদের জনসমর্থনের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব সংসদে পায়। এটি টেকসই হবে না। ভবিষ্যতে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।”

তিনি আরও বলেন, “দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি নিষিদ্ধ—এমন নির্বাচনকে কীভাবে গ্রহণযোগ্য বলা যায়? যুক্তরাজ্যে যদি টোরি বা লিবারেলদের যে কোনো একটি দল নিষিদ্ধ করা হতো, সেটার সমতুল্য পরিস্থিতি এটি। একে কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যায় না।”

আইটিভির সাংবাদিক তখন প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলেই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল—তাহলে বিষয়টি কীভাবে ‘নজিরবিহীন’? জবাবে জয় দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেনি। আদালতের রায়ের কারণে তারা নির্বাচন করতে পারেনি। গঠনতন্ত্র সংশোধন করলে তারা আবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এবারের নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বললেও আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ছিল। সেই প্রসঙ্গ তুলে মাহাথির পাশা প্রশ্ন করেন, জয়ের মূল্যায়নকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হবে। জবাবে জয় বলেন, বিষয়টি ‘পুরোপুরি সঠিক নয়’। তিনি দাবি করেন, গত তিনবারের মধ্যে প্রথম ও তৃতীয়বার বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করেছিল। দ্বিতীয়বারের ক্ষেত্রে জনমত জরিপগুলোতে আওয়ামী লীগের বড় জয় দেখাচ্ছিল। তবে প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে অনিয়ম করেছেন বলে তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “সেগুলো তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, হয়নি। তবে সামগ্রিক ফলাফলে তার প্রভাব পড়ত না।”

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বিরোধী মত দমন এবং ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ প্রসঙ্গে সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ নিয়ে কথা বলার অবস্থান আওয়ামী লীগের আছে কি না। জবাবে জয় ২০১৪ সালের নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আওয়ামী লীগ কাউকে ‘নিষিদ্ধ করেনি’। তার ভাষায়, এটিই আগের তিন নির্বাচনের সঙ্গে এবারের ভোটের ‘মৌলিক পার্থক্য’।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিদেশি সাংবাদিকরা যদি বলেন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তা তিনি মানবেন কি না—এ প্রশ্নে জয় বলেন, “না, মেনে নেওয়া যায় না।” তিনি দাবি করেন, অল্পসংখ্যক পর্যবেক্ষক সরকারের তত্ত্বাবধানে চলাচল করছেন। স্বাধীনভাবে ভ্রমণের সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গত ১৫ বছরে দুর্নীতি, অপহরণ, গুম এবং মতপ্রকাশ দমনের অভিযোগ বিবেচনায় আওয়ামী লীগ কি আংশিক দায় এড়াতে পারে—এ প্রশ্নে জয় বলেন, একই ধরনের অভিযোগ বিএনপি আমলেও ছিল। অথচ এখন তাদের ‘সেলিব্রেট’ করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

চব্বিশের আন্দোলন প্রসঙ্গে জয় ‘কিছু ব্যর্থতা’ থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছিল এবং দাবিও যৌক্তিক ছিল। তিনি দাবি করেন, ২০১৮ সালে সরকার কোটা কমিয়েছিল। পরে একটি মামলার ভিত্তিতে আদালত কোটা পুনর্বহাল করায় আন্দোলন শুরু হয়। সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল বলেও তিনি বলেন। তবে সরকারের ব্যর্থতা ছিল বিষয়টি ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে কথা বলতে না পারা।

জয়ের দাবি, জামায়াতে ইসলামী ওই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকে সরকার পতনের দিকে ঠেলে দেয়। তিনি বলেন, সহিংসতা শুরু হলে সরকারও তা মোকাবিলায় ভুল করে। বিষয়টি এত দূর গড়ানো উচিত ছিল না।

আন্দোলনের সময় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন বলে বলা হয়। এ প্রসঙ্গে জয় প্রশ্ন তোলেন, সরকার পতনের দিন ৫ আগস্ট হলে পুরো সময়ের দায় কীভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর দেওয়া হয়। তিনি বলেন, আন্দোলনে পুলিশ সদস্য এবং আওয়ামী লীগপন্থি কর্মীরাও নিহত হয়েছেন। সব মৃত্যুর দায় সরকারকে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নিহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গে জয় বলেন, তার মা নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। সমবেদনা জানিয়েছেন। বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। সব হত্যাকাণ্ড তদন্তে একটি বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করেছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনার ফাঁস হওয়া অডিওতে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যার নির্দেশ’ আছে বলে অভিযোগ প্রসঙ্গে জয় আগের মতই বলেন, বিবিসি ও আল জাজিরা যে অংশ প্রচার করেছে, সেটি কেটে নেওয়া অংশ। তার দাবি, পুরো রেকর্ডিংয়ে সহিংস আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার এবং জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনে শক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

জুলাই-অগাস্টের ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে আছেন। তিনি দেশে ফিরলে কী হবে—এ প্রশ্নে জয় বলেন, তিনি উদ্বিগ্ন নন। কারণ তার বিশ্বাস, দেশের অন্তত অর্ধেক মানুষ এই নির্বাচন ‘মেনে নেবে না’।

জয়ের বিরুদ্ধে প্লট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের রায় রয়েছে। এ অবস্থায় তিনি দেশে ফিরবেন কি না—এ প্রশ্নে জয় বলেন, তিনি বাংলাদেশে থাকেন না। জীবনে মোট সাত বছর বাংলাদেশে কাটিয়েছেন। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তবে একসময় দেশে ফিরবেন বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, “তারেক রহমান, যিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন, তিনি এখন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। এসব পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হয় না।” তবে তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতিতে নামবেন—এমন কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। অতীতে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদের কিছু দণ্ড বাতিল হয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না—এ প্রশ্নে জয় বলেন, তার কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি একদিন ফিরবেন। তবে এই মুহূর্তে দেশে ফেরা ‘একেবারেই নিরাপদ হবে না’ বলেও তিনি মনে করেন। ভারতে থাকা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। তার ভাষায়, ভারত এখন শেখ হাসিনার জন্য ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা’।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও সংস্কার প্রসঙ্গে জয় বলেন, সংস্কার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। দল নিজস্ব নেতৃত্ব ঠিক করবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দলীয় বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন বা স্বাভাবিক রাজনৈতিক যোগাযোগ সম্ভব নয় বলেও তিনি দাবি করেন।

কারা জবাবদিহির আওতায় আসবে—এ প্রসঙ্গে জয় বলেন, প্রতিবাদকারীদের হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে দায়মুক্তি দেওয়া হলে বিচার অর্থহীন হয়ে যাবে।

তারেক রহমান ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’ চান না বলে জানিয়েছেন। জয় কি তার কাছে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ করবেন—এ প্রশ্নে জয় বলেন, এটি তার হাতে নেই। এটি দলের সিদ্ধান্ত। তবে তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে কথা বলা উচিত এবং তিনি আগেও তা বলে এসেছেন।

জয় বলেন, “নির্বাচনটি ভুয়া। তবে যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে অবশ্যই আমরা তার সঙ্গে কথা বলব এবং তার সঙ্গে কাজ করব।”

বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নে জয় বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ দলীয় কাউন্সিলে ভোট দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করেন। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা থাকলে অনেক আগেই হতে পারতেন। তবে তার কখনও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। তার ভাষায়, “আমার কখনোই ক্ষমতা বা টাকার প্রতি লোভ ছিল না। আমি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারলেই খুশি।”

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...