
এম নুরুন্নবী সোহেল
নির্বাচনের ফল নিয়ে ‘কারচুপি’ আর ভোটের পর ‘হামলার’ অভিযোগ তুলে শুক্রবার রাতে প্রয়োজনে নিজেদের পথ ধরার কথাও বলেছেন জামায়াত জোটের নেতারা। তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এখন সবার সামনে বড় প্রশ্ন, সংসদে এই জোটের পরবর্তী ভূমিকা কী হবে। সে আলোচনা শুরু হয়েছে জোটের শরিক দলগুলোর ভেতরেও।

এরই মধ্যে জামায়াত তাদের নির্বাহী কমিটিতে বিষয়টি তুলেছে। তারা চাইছে নির্বাচনি জোটকে সংসদে বিরোধী দলীয় জোটে রূপ দিতে। শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও একই সুরে বলেছে, তাদের ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ এখন থেকে ‘১১ দলীয় ঐক্যজোট’ নামে কাজ করবে।
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হয়েছে। ২৯৯ আসনে ভোট হলেও ফল দেওয়া হয়েছে ২৯৭টির। এর মধ্যে ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে জামায়াত জোট। জামায়াত একাই পেয়েছে ৬৮ আসন, যা তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। শরিকদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি পেয়েছে ৬ আসন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসন।
নির্বাচনের আগে ১৬ জানুয়ারি জামায়াতের নেতৃত্বে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ গঠিত হয়। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে আলাদা নির্বাচন করে একটি আসন পায়।
এখন নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস। কিন্তু জোটের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বলছেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে যে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেদিকেও তারা নজর রাখছেন।
তবে নির্বাচন-পূর্ব ৬ ফেব্রুয়ারি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান জামায়াতের সঙ্গে ঐকমত্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। জামায়াত জোটের কোনো শরিককে সরকারে যুক্ত করা হবে কি না—এ নিয়ে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উদ্যোগ নেই। ভেতরে ভেতরে এনসিপি বা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নিয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত দেখা গেলেও শনিবার বিকাল পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জাতীয় সরকার নিয়ে চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে বক্তব্য রেখেছেন, তবে এখন কারা থাকবেন—তা নিয়ে আলোচনা হয়নি; আগামী দুয়েক দিনে বিষয়টি ঠিক হবে বলে তিনি আশা করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে জোটের করণীয় কী, তা নিয়ে ১১ দলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। শুক্রবার জামায়াত নির্বাহী কমিটির বৈঠক করেছে। দলটির একজন নেতা জানিয়েছেন, বৈঠকে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যকে বিরোধী দলের ভূমিকায় যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। জোটের ভূমিকা নিয়ে শনিবার বৈঠকে বসছে লিয়াঁজো কমিটি। জামায়াতের মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠকটি হবে।
একই আলোচনা চলছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসেও। দলটির আমির মামুনুল হক জানিয়েছেন, ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ এখন ‘১১ দলীয় ঐক্যজোট’ নামে কাজ করবে।
অন্যদিকে এনসিপির মধ্যে এখনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছে দলটি। শনিবার সকালে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আকরাম হোসাইন বলেছেন, তারা জোট চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে, তবে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
গত বছর রাষ্ট্র সংস্কারের দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ চলার মধ্যে পাঁচ দফা নিয়ে মাঠে নামে ইসলামপন্থি কয়েকটি দলসহ আট দল। সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট ছিল তাদের যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম দাবি। কিন্তু এখন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলাদা হয়ে যাওয়ার পর আগের সেই এক মঞ্চের চিত্র বদলে গেছে।
শুরুতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাগপা, নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ছিল এই মোর্চায়। পরে নির্বাচনি জোটের আলোচনা শুরু হলে এনসিপি ও এলডিপি, এরপর এবি পার্টি যুক্ত হয়। ইসলামী আন্দোলন সরে যাওয়ার পর যোগ হয় বাংলাদেশ লেবার পার্টি।
এলডিপি, নেজামে ইসলাম পার্টি, এবি পার্টি ও বিডিপি জোটগত নির্বাচনে অংশ নিলেও কোনো আসনে জয় পায়নি। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাগপা ও লেবার পার্টি কোনো আসন না নিয়েই জোটে রয়েছে। এলডিপির দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, অলি আহমদ ঢাকায় ফিরলে দলীয় বৈঠকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে, তবে তারা জোটে আছেন এবং আজ সমন্বয় কমিটির বৈঠক হবে।
জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নে নির্বাচনি ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’ এখন বিরোধী দলীয় ভূমিকায় যাবে এবং সমন্বয় কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় জামায়াত জোট এখন দুই দিকের টানে। একদিকে সংসদে বিরোধী জোট হিসেবে কাঠামোগতভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা। অন্যদিকে জাতীয় সরকার গঠনের আলোচনায় সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখার আগ্রহ। শনিবারের বৈঠকগুলোই ইঙ্গিত দেবে, এই জোট সত্যিই “নতুন ভূমিকায়” যাচ্ছে কি না, নাকি নির্বাচনি সমঝোতার পর তারা আলাদা পথেই হাঁটবে।





