নতুন মার্কিন নীতি, ভারতের বাড়তি ভূমিকা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ

Date:

spot_img


আলী কদর পলাশ

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বৈদেশিক নীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে তথাকথিত বিশ্বের অভিভাবক ভূমিকা থেকে। এর বদলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপর বাড়তি দায়িত্ব দিতে চায় তারা। দক্ষিণ এশিয়ায় সেই দায়িত্ব মূলত ভারতের কাঁধেই দিতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক হিসাব নিকাশ শুরু হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত যদি এই নতুন ভূমিকায় আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্য আবারও কূটনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে।

নয়াদিল্লির রুদ্ধদ্বার বৈঠক

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকদের নিয়ে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ইঙ্গিতপূর্ণ প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক বিশেষজ্ঞ মত দেন, প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক দল সংকটে পড়লে ভারতে অবস্থান করে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার নজির নতুন নয়। তারা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন, ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগ ভারতের মাটিতে বসেই সংগঠিত ছিল। একইভাবে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়েছিল কলকাতায়।

এই বাস্তবতা তুলে ধরে কেউ কেউ মত দেন, প্রয়োজনে ভারতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। বিষয়টি কেবল ইতিহাস নয়। বরং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন এবং ভারতের উদ্বেগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে ছাড়া। এই নির্বাচন ঘিরে ভারতের অবস্থান নিয়ে নয়াদিল্লিতে স্পষ্ট উদ্বেগ রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার গঠিত হবে, তাদের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক কতটা কার্যকর ও স্থিতিশীল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পূর্বপরিচিত শক্তির ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। সে কারণে আওয়ামী লীগের বাইরে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা দিল্লির জন্য স্বস্তিকর নয় বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের।

যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক না পাঠানোর বার্তা

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নির্বাচন পর্যবেক্ষণকে একটি দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকলে সেই নির্বাচন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে বাড়তি সুবিধা পায়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তুলতে ব্যবহৃত হতে পারে।

নির্বাচনের পর ভারতের সম্ভাব্য কূটনৈতিক কৌশল

কিছু কূটনৈতিক বিশ্লেষকের আশঙ্কা, ১২ ফেব্রুয়ারির পর ভারত আন্তর্জাতিক পরিসরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে নয়াদিল্লি কৌশলগতভাবে তথ্য উপস্থাপন করতে পারে। এর লক্ষ্য হতে পারে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ প্রশস্ত করা।

ভারত প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ নেবে না। তবে নীরব কূটনীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে রাখার চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অতীতের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যতের শঙ্কা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৯৬ সালের তুলনা টানছেন। সে বছর বিএনপির নেতৃত্বে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে। সেই সরকার টিকেছিল মাত্র ২১ দিন। প্রবল আন্দোলনের মুখে আবারও নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল তৎকালীন শাসকরা।

এই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরপরই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে আসতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো তখন নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী অবস্থান নেবে।

এই প্রেক্ষাপটেই দেশি বিদেশি গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে ঘিরে আলোচনা বাড়ছে। নতুন মার্কিন নীতি, ভারতের বাড়তি ভূমিকা এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান সব মিলিয়ে আগামী সময়টি যে অত্যন্ত সংবেদনশীল হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে একমত অধিকাংশ বিশ্লেষক।

সূত্র: এপি, ওয়াশিংটন পোস্ট, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, ঢাকা স্ট্রিম, বিএসএস এবং ডেইলি স্টার।

৩০ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...