ট্রেন রেলের, টিকিট ভাগ্যের, মন্ত্রী অসহায় কালোবাজারির কাছে!

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

বাংলাদেশে ট্রেনের টিকিট ক্রয় এখন আর সাধারণ কেনাকাটার পর্যায়ে নাই। ইহা একপ্রকার জাতীয় ভাগ্যপরীক্ষা। যাঁহার ইন্টারনেট দ্রুত, আঙুল ক্ষিপ্র এবং ভাগ্য সুপ্রসন্ন, টিকিট তাঁহার। আর যাঁহার এই তিন গুণের ঘাটতি রহিয়াছে, তিনি বাড়িতে বসিয়া ট্রেনের হুইসেল শুনিয়া মনকে সান্ত্বনা দিতে পারেন। রেলের টিকিট এখন আর যাত্রার কাগজ নহে, ইহা যেন সৌভাগ্যের সনদ। কে পাইল, কে পাইল না, তাহার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নাই। কেবল বলা যায়, কারও ভাগ্যে ছিল, কারও ছিল না।

রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গতকাল জানাইয়াছেন, অনলাইনে টিকিট ক্রয়ের পর অন্যের নিকট অধিক মূল্যে বিক্রয় ঠেকানো কঠিন। আহা, কী নির্মম বাস্তবতা। এত বড় মন্ত্রণালয়, এত কর্মকর্তা, এত প্রযুক্তি, এত সফটওয়্যার, অথচ কয়েকজন টিকিট ব্যবসায়ীর নিকট সকলেই যেন অসহায়। কথাটা শুনিয়া সাধারণ মানুষের মনে বিস্ময় জন্মায় না, জন্মায় একধরনের তিক্ত হাসি। যে রাষ্ট্র নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক হিসাব, করের তথ্য, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, এমনকি নানা সেবার ডিজিটাল রেকর্ড রাখিতে পারে, সেই রাষ্ট্রের রেল টিকিট ব্যবস্থায় কে টিকিট কাটিল, কে ভ্রমণ করিল, আর কে অধিক মূল্যে বিক্রি করিল, তাহা শনাক্ত করা নাকি খুবই কঠিন। কঠিন বটে, তবে কাহার জন্য কঠিন, সেটিই আসল প্রশ্ন।

মন্ত্রী আরও জানাইয়াছেন, ঈদের সময় ৩২ হাজার টিকিটের জন্য ৩৬ হইতে ৩৭ লাখ মানুষ চেষ্টা করেন। একজন চারটি টিকিট কিনিতে পারেন। দশজন মিলিয়া চল্লিশটি টিকিট সংগ্রহ করিতে পারেন। বাহ্, এ তো দেখিতেছি রীতিমতো সমবায় আন্দোলন। দশজন মিলিয়া চল্লিশটি টিকিট সংগ্রহ করিবেন, অতঃপর যাত্রীদের কল্যাণে অধিক মূল্যে বিতরণ করিবেন। ইহাকে কালোবাজারি বলিয়া অপবাদ দেওয়া কি উচিত। বরং নাম দেওয়া যাইতে পারে, ডিজিটাল টিকিট উন্নয়ন সমিতি। কারণ তাঁহারা এমন এক কাজ করিতেছেন, যাহা রাষ্ট্র নিজে থামাইতে পারিতেছে না, কিন্তু সাধারণ যাত্রীকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলিয়া অত্যন্ত সফলতার সহিত পরিচালনা করিতেছেন।

এই ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে করুণ চরিত্র সাধারণ যাত্রী। তিনি ভোরবেলা মোবাইল লইয়া বসিবেন। লগইন করিবেন। ওয়েবসাইট খুলিবে না। খুলিলেও ঘুরিতে থাকিবে। তারপর হঠাৎ লোড হইবে। কিছুক্ষণ পর দেখাইবে, সেশন এক্সপায়ার। আবার চেষ্টা। এবার টিকিট দেখাইল। তিনি উল্লসিত। দ্রুত আসন নির্বাচন করিলেন। তথ্য দিলেন। পেমেন্টে গেলেন। স্ক্রিন থমকাইয়া রহিল। কিছুক্ষণ পর ভাসিয়া উঠিল সেই শাশ্বত বাণী, টিকিট শেষ। তখন তিনি বুঝিবেন, রেলগাড়ি না চলিলেও ভাগ্যের চাকা বেশ দ্রুতই ঘুরিতেছে। দেশের এত এত উন্নয়ন, ডিজিটালাইজেশন, স্মার্ট সেবা, আধুনিক প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব, সবই আছে। কেবল যাহা নাই, তাহা হইল সাধারণ মানুষের হাতে একটি সৎ ও ন্যায্য টিকিট পৌঁছানোর নিশ্চয়তা।

যে দেশে চাকরির আবেদন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, বিদ্যুৎ বিল, মোবাইল ব্যাংকিং, হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কর প্রদান, পাসপোর্ট নবায়ন, আদালতের কাগজপত্র জমা, সবই ধীরে ধীরে অনলাইনে যাইতেছে, সে দেশে ট্রেনের টিকিট একটি প্রযুক্তিগত প্রহসনে পরিণত হওয়া দুঃখজনক। প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল সহজতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় প্রযুক্তি অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীর হাতিয়ার হইয়া দাঁড়ায়। যাত্রী ভোগেন, দালাল ফায়দা লোটেন, কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা দেন, আর মন্ত্রীরা বাস্তবতা জানাইয়া দায় লঘু করেন। এই চক্রে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, নাগরিকের আস্থা কমে, সেবার প্রতি মানুষের বিরক্তি বাড়ে।

প্রশ্ন হইল, কালোবাজারি কি সত্যিই এত দুর্বার শক্তি, যাহাদের সামনে পুরো রেলব্যবস্থা নতজানু। নাকি সমস্যাটি প্রযুক্তির দুর্বলতা, তদারকির অভাব, পরিকল্পনার ত্রুটি, অথবা কোথাও গোপন যোগসাজশের? নাগরিকেরা ইহাই ভাবেন। কারণ তাঁহারা দেখেন, টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়মিত যাত্রী টিকিট পান না, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্টেশনসংলগ্ন নেটওয়ার্ক, অথবা পরিচিত চক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত দামে টিকিট পাওয়া যায়। ইহা যদি দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়, তবে কালোবাজারি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং ইহা পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতার উপর দাঁড়াইয়া থাকা এক সংগঠিত ব্যবসা।

মন্ত্রী অবশ্য আশ্বাস দিয়াছেন, কালোবাজারি শনাক্ত করিতে সফটওয়্যারে নতুন ব্যবস্থা যুক্ত করা যায় কি না, তাহা দেখা হইতেছে। শুনিয়া আশ্বস্ত হইলাম। অর্থাৎ কালোবাজারিরা আপাতত ব্যবসা চালাইবেন, আর কর্তৃপক্ষ গবেষণা করিবেন। এক পক্ষের আয় বাড়িবে, অন্য পক্ষের অভিজ্ঞতা। এই দেখাদেখির রাজনীতি বহু পুরোনো। ঘটনা ঘটে, জনগণ ভোগে, মন্ত্রী বলেন দেখা হইতেছে, কমিটি বসে, প্রতিবেদন হয়, প্রযুক্তি হালনাগাদের কথা ওঠে, তারপর পরবর্তী ঈদ আসে, আবার একই কাহিনি পুনরাবৃত্তি হয়। যেন সমস্যাটি সমাধানের জন্য নহে, বরং প্রতিবছর নতুন করিয়া আলোচনার জন্য বাঁচাইয়া রাখা হইয়াছে।

আমাদের একটি বিনীত প্রস্তাব রহিয়াছে। রেলওয়ে টিকিটের ওয়েবসাইটে একটি নতুন বোতাম সংযোজন করা যাইতে পারে, ভাগ্যে থাকিলে পাইবেন। যাত্রী বোতামে চাপ দিবেন। ভাগ্য ভালো হইলে টিকিট, না হইলে সান্ত্বনাবাণী, আপনার যাত্রা শুভ হউক, যদিও আপনি যাইতে পারিলেন না। চাইলে আরেকটি বোতামও রাখা যাইতে পারে, কালোবাজারির সহায়তা লাগিবে কি না। এতে অন্তত সাধারণ মানুষ আগে হইতেই বুঝিতে পারিবেন, তিনি রাষ্ট্রীয় সেবার লাইনে দাঁড়াইয়াছেন, না ভাগ্যের লটারির সামনে উপস্থিত হইয়াছেন।

আর কালোবাজারিদের জন্য চালু করা যাইতে পারে বিশেষ সম্মাননা, জাতীয় টিকিট ব্যবস্থাপনা পদক। কারণ রাষ্ট্র যাহা নিয়ন্ত্রণ করিতে হিমশিম খাইতেছে, তাঁহারা তাহা দিব্যি নিয়ন্ত্রণ করিয়া চলিয়াছেন। তাঁহাদের সাংগঠনিক দক্ষতা আছে, বাজার চাহিদা বোঝার ক্ষমতা আছে, দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা আছে, কাস্টমার নেটওয়ার্ক আছে, মূল্য নির্ধারণের স্বাধীনতাও আছে। অর্থাৎ রেলের অফিসিয়াল ব্যবস্থার বাইরে একটি অনানুষ্ঠানিক কিন্তু কার্যকর টিকিট অর্থনীতি গড়ে উঠিয়াছে। ইহা নিছক রসিকতা নহে, রাষ্ট্রীয় সেবার ব্যর্থতার এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।

তবে হাস্যরসের আড়ালে একটি গুরুতর প্রশ্ন থাকিয়াই যায়। প্রযুক্তি যদি সাধারণ মানুষের টিকিটপ্রাপ্তি সহজ করিতে না পারে, তবে সেই প্রযুক্তির সার্থকতা কোথায়। অনলাইন টিকিট যদি ভোগান্তি বাড়ায়, কালোবাজারিকে শক্তিশালী করে, আর সত্যিকারের যাত্রীকে বঞ্চিত করে, তবে এই ডিজিটাল কাঠামোর উদ্দেশ্য কী। আমরা কি সেবা সহজ করিবার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করিতেছি, না সমস্যাকে আরো জটিল করিবার জন্য। রেল কি যাত্রীর জন্য, না সফটওয়্যার বিক্রেতা, দালালচক্র ও ব্যর্থ ব্যাখ্যার জন্য।

সমাধান অসম্ভব নয়। প্রত্যেক যাত্রীর জন্য শক্তিশালী পরিচয়ভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা, ক্রয়সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহজনক বহুমাত্রিক আইপি ও ডিভাইস ট্র্যাকিং, অস্বাভাবিক ক্রয়প্যাটার্ন শনাক্তকরণ, তাৎক্ষণিক বাতিল ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, ভ্রমণের সময় টিকিট ও পরিচয়পত্র মিলাইয়া দেখা, এবং কালোবাজারির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অভিযান, এইসব ব্যবস্থা নিলে অন্তত পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টাইতে পারিত। আরও বড় কথা, যাত্রীরা যদি নিয়মিতভাবে জানিতে পারেন, কত টিকিট ছাড়িল, কত বিক্রি হইল, কত বাতিল হইল, কতজন কালোবাজারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হইল, তবে ব্যবস্থার উপর আস্থা বাড়িবে। কিন্তু আমরা উল্টো শুনি, ঠেকানো কঠিন। এই স্বীকারোক্তি আসলে ব্যর্থতার ভাষ্য, এবং নাগরিকের দুঃখের প্রতি একরকম প্রশাসনিক আত্মসমর্পণ।

রেলের টিকিট স্রেফ একটি ভ্রমণপত্র নহে। ইহা সাধারণ মানুষের অধিকার, সময়ের মূল্য, পারিবারিক যাত্রার পরিকল্পনা, ঈদে বাড়ি ফিরিবার আবেগ, রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন, চাকরিপ্রার্থীর গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদ, শিক্ষার্থীর পরীক্ষাকেন্দ্রে যাত্রা, প্রবাসফেরত মানুষের স্বজনের কাছে ফেরা, সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। এই জায়গায় ব্যর্থতা মানে কেবল সফটওয়্যারের ত্রুটি নহে, নাগরিক জীবনের একটি জরুরি সেবায় অবিচার। যে যাত্রী নিয়ম মেনে, সময়মতো, বৈধভাবে টিকিট কিনিতে চান, তাঁহার ভাগ্যে যদি বারবার বঞ্চনা জোটে, আর যিনি নিয়ম ভাঙিয়া কালোবাজারির পসরা সাজান, তাঁহার ভাগ্যে যদি লাভ জোটে, তবে সিস্টেমের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

শেষ পর্যন্ত মনে হইতেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের স্লোগান সত্যিই পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এখনকার বাস্তবতার সঙ্গে মিলাইয়া বলা যাইতে পারে, ট্রেন আমাদের, টিকিট ভাগ্যের, আর মন্ত্রী অসহায় কালোবাজারির। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো স্লোগানই এমন আত্মসমর্পণের ভাষা হওয়া উচিত নহে। রাষ্ট্রের ভাষা হইতে হইবে নিশ্চয়তার, জবাবদিহির, ন্যায্যতার। যাত্রীকে ভাগ্যের হাতে ছাড়িয়া দেওয়া রেলের কাজ নহে। তাঁহাকে সেবা দেওয়া, প্রতারণা ঠেকানো, কালোবাজারি ভাঙা, এবং টিকিটকে নাগরিক অধিকার হিসাবে ফিরাইয়া দেওয়া, এই দায়িত্ব এড়াইবার উপায় নাই।

গ্রামের এক হাটে দুই দোকান ছিল। এক দোকানি বলিত, আমার দোকানে জিনিস কম, কিন্তু মাপে ঠিক। আরেক দোকানি বলিত, জিনিস বেশি, কিন্তু ভাগ্য ভালো থাকিলে পাইবেন। লোকজন প্রথমে দ্বিতীয় দোকানে ভিড় করিল, পরে ফিরিয়া গেল প্রথম দোকানে। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত সৌভাগ্য নয়, ন্যায় চায়। বাংলাদেশের রেল টিকিট ব্যবস্থাও সেই সত্যটাই আবার মনে করাইতেছে। নাগরিক ভাগ্য কিনিতে চায় না, সে তার ন্যায্য টিকিটটাই চায়।


লেখক: প্রধান সম্পাদক।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

প্রাইভেট কার থেকে ২৪ কেজি গাঁজা ও ৩টি মোবাইল ফোন জব্দ, আটক ২

কুমিল্লা প্রতিনিধি কুমিল্লায় প্রাইভেট কার তল্লাশি করে ২৪ কেজি...

যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আনন্দ র‍্যালি ও উল্লাস উদযাপন

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আনন্দ র‍্যালি...

ফেলে দেওয়া নারিকেলের ছোবড়ায় নতুন সম্ভাবনা, তৈরি হচ্ছে ফাইবার-কোকোফিড

বাগেরহাট প্রতিনিধি একসময় নারিকেলের ছোবড়া ফেলে দেওয়া হতো, কোথাও আবার...

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত

খুলনা প্রতিনিধি ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে...