
বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপোতে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, ডিজিএম আশরাফুলের বিরুদ্ধে দুদকে নালিশ, লগবই জালিয়াতি থেকে যন্ত্রাংশ ও জ্বালানি বাণিজ্যের অভিযোগ
নাছির উদ্দিন লিটন
সরকারি ট্রাক মালামাল নিয়ে ফিরছে ঢাকায়। অথচ দাপ্তরিক লগবইয়ে দেখানো হচ্ছে ‘খালি ট্রাক’ বা ‘রিটার্ন ট্রিপ’। ভাড়ার টাকা জমা হচ্ছে না সরকারি কোষাগারে। অভিযোগ উঠেছে, এভাবেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ঢাকা ট্রাক ডিপোতে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আত্মসাৎ করা হয়েছে। শুধু পরিবহন ভাড়াই নয়, সরকারি ট্রাকের মূল্যবান যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়া, জ্বালানি তেলের ভুয়া বিল তৈরি এবং সচল গাড়িকে অকেজো দেখিয়ে ভাঙারি হিসেবে বিক্রির চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। এসব অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে বিআরটিসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে।
ডিপোর কর্মচারীদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা হয়েছে লিখিত অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি সম্পদ ও রাজস্ব আত্মসাতের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। আশরাফুল আলম ঢাকা ট্রাক ডিপোর দায়িত্বে থাকাকালে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। তবে আশরাফুল আলম অভিযোগগুলো অস্বীকার করে সেগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, বিআরটিসির ভারী ট্রাকগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি সার, খাদ্যশস্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন করে। মালামাল পৌঁছে দেওয়ার পর ফেরার পথে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ট্রাক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালামাল নিয়ে ফিরলেও সংশ্লিষ্ট লগবইয়ে সেসব যাত্রাকে খালি ট্রিপ হিসেবে দেখানো হয়। এর ফলে প্রকৃত পরিবহন আয় সরকারি হিসাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
কর্মচারীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ট্রিপের ভাড়া এবং সরকারি হিসাবে জমা হওয়া অর্থের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কত টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, তা নির্ধারণে ট্রাকভিত্তিক লগবই, চালানের কপি, ভাড়ার রসিদ ও ব্যাংকে জমার হিসাব মিলিয়ে নিরীক্ষার প্রয়োজন।
নতুন ট্রাকের যন্ত্রাংশ নিয়েও অভিযোগ
পরিবহন ভাড়ার পাশাপাশি সরকারি ট্রাকের যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নতুন ও সচল ট্রাক থেকে উন্নতমানের টায়ার, ব্যাটারি ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে সেখানে পুরোনো ও নিম্নমানের সামগ্রী লাগানো হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, খুলে নেওয়া যন্ত্রাংশ রাজধানীর তেজগাঁও ও ধোলাইখালের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়। এতে সরকারি সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি যানবাহনের কার্যক্ষমতা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে কোন গাড়ি থেকে কতটি যন্ত্রাংশ সরানো হয়েছে, তার স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি বিলে ভুয়া কিলোমিটার দেখানোর অভিযোগ
ডিপোর জ্বালানি ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের দাবি, ট্রাকের প্রকৃত চলাচলের দূরত্বের তুলনায় দাপ্তরিক হিসাবে বেশি কিলোমিটার দেখিয়ে অতিরিক্ত ডিজেল ও লুব্রিকেন্টের বিল তৈরি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত উত্তোলন দেখানো জ্বালানির একটি অংশ অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এসব বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন কর্মচারীরা।
এ ছাড়া সামান্য মেরামতের মাধ্যমে সচল করা সম্ভব, এমন কয়েকটি ভারী ট্রাককে মেরামতের অযোগ্য দেখিয়ে দীর্ঘদিন ফেলে রাখার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, পরে এসব গাড়ি কম দামে ভাঙারি হিসেবে বিক্রির সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
২০১৯ সালেও মন্ত্রণালয় থেকে তদন্তের তাগিদ
আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের ইতিহাস পুরোনো। ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটিসি শাখা থেকে পাঠানো একটি স্মারকের বিবরণ অনুযায়ী, শ্রমিক কর্মচারীদের পক্ষ থেকে মো. নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনের দাখিল করা অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
স্মারক নম্বর ৩৫.০০.০০০০.০১৩.১৬.০০১.১৭.২৭৪ অনুযায়ী, আগে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন চাওয়া হলেও তা না পাওয়ায় তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য পুনরায় তাগিদ দেওয়া হয়।
একই বছরের ৩ ডিসেম্বর আইন অধিশাখার আরেকটি স্মারকেও অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।
পুরোনো অভিযোগপত্রে গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে ভলভো বাস মেরামতের অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রায় আট কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তোলা হয়েছিল। তবে ওই অভিযোগে দুদকের মামলার বর্তমান অবস্থা এবং আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিআরটিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা জানিয়েছিলেন, বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত ৮ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে মীর আহমেদ তারিকুল ওমরকে বিআরটিসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আব্দুল লতিফ মোল্লাকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পরিবহন খাতে আয়ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লগবই, জ্বালানি বরাদ্দ, ট্রিপভিত্তিক ভাড়া ও যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত নিরীক্ষা জরুরি। ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং নিয়মিত তদারকি থাকলে এ ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হয়।
সব অভিযোগ অস্বীকার ডিজিএম আশরাফুলের
অভিযোগের বিষয়ে ডিজিএম মো. আশরাফুল আলমের বক্তব্যও রয়েছে। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
তাঁর ভাষ্য, একটি নির্দিষ্ট মহল ডিপোর শৃঙ্খলা নষ্ট করতে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন বলে আশাবাদী।
অন্যদিকে অভিযোগকারী কর্মচারীদের প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় সাধারণ কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। তাঁদের ন্যায্য ট্রিপ বোনাস ও অতিরিক্ত কাজের পাওনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ঢাকা ট্রাক ডিপোতে প্রকৃতপক্ষে কতটি ট্রিপের আয় সরকারি হিসাবে জমা হয়নি, কত পরিমাণ জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের হিসাবের অসংগতি রয়েছে এবং এসব অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত?
২০১৯ সালের প্রশাসনিক নির্দেশনা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক অভিযোগ পর্যন্ত ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী কর্মচারীরা।





