
রংপুর ব্যুরো
বাম্পার ফলনই যেন রংপুরের আলুচাষিদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠে উৎপাদিত আলুর ন্যায্য দাম না পেয়ে দিশেহারা কৃষক। হিমাগার থেকে আলু তুলতে যে খরচ হচ্ছে, বিক্রির দাম তার ধারেকাছেও নেই। ফলে প্রতি কেজি আলুতে ১৪ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত লোকসানের আশঙ্কা করছেন অনেক চাষি। কেউ লোকসান কমানোর আশায় হিমাগারে আলু রেখে দিয়েছেন, আবার কেউ নতুন মৌসুমের আলু চাষ শুরু করলেও আগের বছরের আলু বিক্রি করতে পারছেন না। এরই মধ্যে মাঠে শুরু হয়েছে নতুন আলুর আবাদ। পুরোনো আলুর মজুত, সীমিত সংরক্ষণক্ষমতা ও বাজারে দরপতন এই তিন সংকটে দিশেহারা রংপুর অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। রংপুর জেলার ৮ উপজেলায় আলুর একই চিত্র। বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, রংপুর সদর ও মিঠাপুকুরের কৃষকেরা ন্যায্য দাম না পেয়ে উৎপাদন খরচ তোলার চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। কৃষকদের আশঙ্কা, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আলু চাষে বিনিয়োগ করা বিপুল অর্থ লোকসানের মুখে পড়বে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান গত রবি মৌসুমে ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেন। উৎপাদিত আলুর ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তা হিমাগারে সংরক্ষণ করেন তিনি। এর মধ্যে ৩ হাজার ১৪২ বস্তা আলু বিক্রি করে পেয়েছেন ১৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। কিছুদিন আগে প্রায় ২৫০ বস্তা আলু কেজিপ্রতি মাত্র ১৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। আতাউর রহমানের হিসাবে, হিমাগার থেকে আলু তোলা পর্যন্ত প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৭ টাকা। অথচ বর্তমানে হিমাগার গেটে আলুর দাম নেমে এসেছে ১১ থেকে ১৪ টাকায়। এই দামে আলু বিক্রি করলে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় মিলিয়ে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে তাঁকে। আতাউর রহমান বলেন, “লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই কতটা তুলতে পারব, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। গত বছর ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদে প্রায় ৫৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। সেই টাকাই তুলতে পারিনি। এখন পথে বসার অবস্থা।”
শুধু আতাউর রহমান নন, একই সংকটে রয়েছেন রংপুর মহানগরীর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায়। দুটি হিমাগারে তাঁর ৫০০ বস্তা আলু সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানে যে দামে আলু বিক্রি হচ্ছে, তাতে কেজিতে সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। তাই আপাতত আলু বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভুপাল চন্দ্র রায় ও আতাউর রহমানের মতো অন্তত ১৫ জন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হিমাগার গেটে বর্তমানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১১ থেকে ১৪ টাকায়। এর মধ্যে হিমাগার ভাড়া ও আলু তোলার খরচেই কেজিপ্রতি প্রায় ৭ টাকা চলে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় কৃষকের হাতে থাকছে খুব সামান্য অর্থ; অনেক ক্ষেত্রে লোকসান এড়ানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। অথচ বিভাগের ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন, যা মোট উৎপাদনের ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। সংরক্ষিত আলুর মধ্যে ৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন, অর্থাৎ প্রায় ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ এখনো হিমাগারে মজুত রয়েছে। অন্যদিকে, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর দেশে আলু উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন। সরকারি-বেসরকারি ৪০২টি হিমাগার ও ৭০৩টি অ-হিমায়িত মডেল ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৭ টন। এর মধ্যে ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৮ টন খাবার আলু এবং ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টন বীজ আলু।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) হিসাব অনুযায়ী, তাদের হিমাগারগুলোতে এবার ৩৩ লাখ টনের বেশি আলু রাখা হয়েছে। এর মধ্যে এখনো ১৫ লাখ টনের বেশি মজুত রয়েছে। গত বছরও কম দামের কারণে কৃষকেরা প্রায় দুই লাখ টন আলু হিমাগার থেকে তোলেননি।
কৃষকের কাছ থেকে কম দামে আলু কেনা হলেও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রংপুরের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২২ টাকায়। রাজধানী ঢাকায় একই আলুর দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা। উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয়ের তুলনায় কৃষক কম দাম পেলেও মধ্যবর্তী বাজারব্যবস্থায় দামের এই ব্যবধান তাঁদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
তারাগঞ্জ উপজেলার বামনদীঘি গ্রামের কৃষক নাহিদুজ্জামান বলেন, এবার বৃষ্টির পানিতে আলু পচে উৎপাদন কমে গেছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তাঁর খরচ হয়েছে ২০ টাকা। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে বাধ্য হয়ে ১০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। এতে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা লোকসান হয়েছে। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার কৃষক আমজাদ হোসেন আগের মৌসুমের আলু হিমাগারে রেখেই নতুন করে আলু চাষ শুরু করেছেন। লোকসান কমানোর আশায় পুরোনো আলু ধরে রেখেছেন তিনি। তবে নতুন আলুর উৎপাদন বাজারে আসতে শুরু করলে পুরোনো আলুর দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বদরগঞ্জের শাহজালাল ও গঙ্গাচড়ার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি বলেন, গত দুই দিন ধরে হিমাগার গেটে প্রকারভেদে প্রতি কেজি আলু ১১ থেকে ১৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হিমাগার দুটির ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ১৫ হাজার ও সাড়ে ৯ হাজার টন। বর্তমানে সেখানে যথাক্রমে ৪০ ও ৪৮ শতাংশ আলু মজুত রয়েছে।
পীরগাছার নব্দীগঞ্জের অপু মুন্সি হিমাগারের ব্যবস্থাপক রবিউল বলেন, গত বছর একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ে আলু তোলেননি। ফলে হিমাগার কর্তৃপক্ষ ১ লাখ ৬৬ হাজার বস্তা আলু কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এতে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
তারাগঞ্জের এনএন হিমাগারের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম জানান, তাঁদের হিমাগারের ২ লাখ ৫০ হাজার বস্তার মধ্যে মাত্র ৬৩ হাজার বস্তা আলু বের হয়েছে। অন্য বছর এ সময়ে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আলু বের হয়ে যেত। আগামী ৪৫ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে বাজারে নতুন আলু আসার কথা। বর্তমান গতিতে আলু উত্তোলন চলতে থাকলে সব আলু হিমাগার থেকে বের করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, গত বছর মাইকিং করেও অনেক কৃষক আলু তোলেননি। শেষ পর্যন্ত কিছু আলু ফেলে দিতে হয়েছে। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে হিমাগার কর্তৃপক্ষকে লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, হিমাগারের ভাড়া বেশি হওয়ায় আলু সংরক্ষণ করেও লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না। ভাড়া কমানোর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। তাঁরা প্রতি কেজি আলুর হিমাগার ভাড়া ৫ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, আলুর দাম ১৩ টাকায় নেমে আসায় হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন ধীর হয়ে গেছে। উৎপাদন, সংরক্ষণ, বস্তা, পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে কৃষকের ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। লোকসানের আশঙ্কায় কৃষকেরা আলু তুলছেন না। এতে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি হিমাগারের ভাড়া আদায় ও পরিচালন ব্যয় নিয়েও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়া এবং প্রয়োজনে সরকারিভাবে আলু কেনার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, গত দুই বছর ধরে আলু চাষে লোকসান হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি। কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করতে এবং একই ফসলের ওপর নির্ভরতা কমাতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিছু জমিতে ভুট্টা, সবজি ও ধান চাষ করলে একটি ফসলে লোকসান হলেও অন্য ফসল থেকে তা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, আলুচাষিদের লোকসান কমাতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁর মতে, হিমাগার ভাড়ার অন্তত ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া এবং কৃষকদের মূল্য সহায়তার আওতায় আনা যেতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে বছরে আলুর চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। অথচ সর্বশেষ মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টন। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন, পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থার অভাব এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বারবার লোকসানে পড়ছেন কৃষকেরা।
তাঁদের মতে, আলুর বহুমাত্রিক ব্যবহার বাড়ানো, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশ, রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে আলুর বাম্পার ফলন কৃষকের জন্য বারবার দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠবে।





