
আলী কদর পলাশ
বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় শোকপ্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। গতকাল ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ রাজ্যসভা বসার পরপরই রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সিপি রাধাকৃষ্ণন খালেদা জিয়াসহ প্রয়াত দুই সাবেক ভারতীয় সংসদ সদস্য এল গণেশন ও সুরেশ কালমাদির স্মরণে শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন এবং প্রথা অনুযায়ী নীরবতা পালন করা হয়। এই ঘটনাটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সৌজন্য, শিষ্টাচার এবং পারস্পরিক মর্যাদার এক দৃশ্যমান ঘোষণা।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বহুদিন ধরেই উত্তাপ, সন্দেহ এবং কঠোর বক্তব্যের চাপে ক্লান্ত। এই বাস্তবতায় এমন শোকপ্রস্তাবের মূল্য অনেক। কারণ রাষ্ট্র সম্পর্কের ভিত্তি কেবল স্বার্থ নয়। মানবিকতাও। সম্মানও। শোকের মুহূর্তে প্রতিবেশী দেশের সংসদ যখন শ্রদ্ধা জানায়, তখন তা মানুষের মনেও সম্পর্কের ভাষা নরম করে। সংলাপের পথকে সহজ করে। অকারণ দূরত্ব কমায়।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ এক অধ্যায়। তার নেতৃত্ব ছিল সমর্থন ও বিরোধিতার তীব্রতার ভেতর দিয়ে নির্মিত। তিনি ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে। আবার তিনি ছিলেন ইতিহাসের কেন্দ্রে। জীবদ্দশায় বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পরে রাষ্ট্র ও সমাজ যখন স্মরণ করে, তখন স্মরণটি ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। সেটি জনজীবনের প্রভাবকে স্বীকার করার নাম। এই স্বীকারোক্তিই সভ্যতার পরিচয়।
ভারতের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ যে কেবল সংসদীয় পর্যায়ে সীমিত ছিল তা নয়। খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। আবার নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং শোক বইতে স্বাক্ষর করে সমবেদনা জানান এবং বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক জোরদারে খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করেন। এসব পদক্ষেপ মিলিয়ে যে ছবি তৈরি হয়, তা হলো একটি শোককে রাষ্ট্রের সৌজন্য দিয়ে সম্মান করার সংস্কৃতি।
আমাদের জন্য এখানেই শিক্ষা আছে। ভিন্ন মত মানেই শত্রুতা নয়। মতভেদ মানেই অবমাননা নয়। গণতন্ত্রের শক্তি মতের বহুত্বে। রাজনৈতিক পরিপক্বতা প্রতিপক্ষকে সম্মান করার ক্ষমতায়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি যদি উত্তাপ কমাতে চায়, তবে শিষ্টাচারকে রাজনীতির ভাষায় ফিরিয়ে আনতে হবে। শোকের মুহূর্তেও যদি সৌজন্য সম্ভব হয়, তবে জীবনের রাজনীতিতেও তা সম্ভব।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমরাও পুনরায় গভীর শোক প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চাই, এই শোকপ্রস্তাবের মধ্য দিয়ে যে সৌজন্যের বার্তা উঠে এসেছে, তা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। দক্ষিণ এশিয়ায় যেন সৌজন্য আবার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। কারণ সৌজন্য দুর্বলতা নয়। সৌজন্যই আসলে শক্তির পরিমাপ। সম্মানই শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করে।
২৯ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা





