
রয়টার্স অবলম্বনে এম হোসেন আহমেদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২৫ বছর বয়সী সাদমান মুজতবা রাফিদ শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দিতে বাবা মায়ের নিষেধ ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই আন্দোলনই বংশানুক্রমিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখবে।
কিন্তু সেই আন্দোলনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন সামনে আসতেই রাফিদের সেই আশাবাদ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তিনি বলেন, আমরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে লিঙ্গ, জাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে সবার সমান সুযোগ থাকবে। আমরা নীতিগত পরিবর্তন ও সংস্কার আশা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের স্বপ্নের অনেক দূরে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার শাসনে দমনপীড়ন, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে হাজার হাজার তরুণ রাজপথে নেমে আসে। তারা একটি নতুন বাংলাদেশ চেয়েছিল।
এই নির্বাচন ২০০৮ সালের পর প্রথমবার শেখ হাসিনাবিহীন সরকার গঠনের পথ খুলে দিলেও বড় কোনো সংস্কার হয়নি। নতুন কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্পও গড়ে ওঠেনি বলে মনে করছেন অনেকে।
ফলে সরকার গঠনের লড়াই মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিএনপি এবং ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
মতামত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিতর্কিত হলেও প্রতিষ্ঠিত দলগুলোই এগিয়ে আছে।
রয়টার্স ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ৩০ বছরের কম বয়সী ৮০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে। অধিকাংশই মুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে উৎসাহী। তবে প্রার্থীদের নিয়ে তারা হতাশ।
পুরোনো শক্তি বনাম ছাত্র ইসলামপন্থী জোট
৩০ বছরের নিচের তরুণরা, যাদের জেন জি বলা হয়, আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল। তারা দেশের মোট ভোটারের এক চতুর্থাংশের বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, তারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। তারা ভোট দেবে এবং ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।
অনেকে আশা করেছিলেন আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে গঠিত নতুন দল ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টিকে তারা সমর্থন দেবেন। কিন্তু দলটি তাদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করায় দলটির গ্রহণযোগ্যতা আরও কমেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ২৩ বছর বয়সী শুদ্রুল আমিন বলেন, তারা নৈতিক উচ্চতা হারিয়েছে। যারা অতীতের বোঝামুক্ত নতুন বাংলাদেশ চেয়েছিল, তারা এখন পুরোনো শক্তি আর ছাত্র ইসলামপন্থী জোটের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
২৪ বছর বয়সী হিন্দু শিক্ষার্থী শামা দেবনাথ বলেন, রাজনীতি এখনো এই না ওই কাঠামোয় বন্দী। নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই।
বিপ্লবের চেতনা হারিয়ে গেছে
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও অনেক তরুণকে হতাশ করেছে। সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
২৩ বছর বয়সী বৌদ্ধ শিক্ষার্থী হেমা চাকমা বলেন, এক বছর পর মনে হয় জুলাই বিপ্লবের চেতনা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। আগের পরিস্থিতি ভালো ছিল না। কিন্তু এখন সহিংসতা আরও বেড়েছে। সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
তরুণদের অসন্তোষের আরেকটি বড় কারণ অর্থনীতি। এই সংকটই শেষ পর্যন্ত হাসিনার দেশত্যাগের পথ তৈরি করে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, নতুন দল হওয়ায় তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সদস্যরা তরুণ। সংগঠন দুর্বল। অর্থ ও মাঠ পর্যায়ের শক্তিও কম।
তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট কৌশলগত। আদর্শিক নয়। শরিয়াহ আইন চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই।
ভোট দিতে আগ্রহী মানুষ
সব হতাশার মাঝেও তরুণরা ভোট নিয়ে আশাবাদী।
৩০০ আসনের এই নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে একটি গণভোটও হবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রস্তাব থাকবে।
বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ভোট দিতে আগ্রহ ৯৭ শতাংশ। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমর্থন প্রায় সমান।
২৬ বছর বয়সী আন্দোলন নেতা উমামা ফাতেমা বলেন, মানুষ ভোট দেবে। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেবল নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকারই দেশকে এগিয়ে নিতে পারে।
২৫ বছর বয়সী মাইশা মালিহা বলেন, নতুন ছাত্রদের দল আমাদের আশা ভেঙে দিয়েছে। তাই আমি বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশকে এগোতে হলে শক্ত সংগঠিত দল দরকার।
অন্যদিকে ২০ বছর বয়সী এরিশা তাবাসসুম বলেন, বিএনপিকে আমরা আগে দেখেছি। জামায়াত অন্তত নতুন বিকল্প।
হাল ছাড়তে রাজি নন অনেকে
যুক্তরাজ্য থেকে ফিরে এনসিপিতে যোগ দিলেও জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে দল ছাড়েন চিকিৎসক তাসনিম জারা। এখন তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী।
৩১ বছর বয়সী জারা বলেন, পুরোনো রাজনীতির বাইরে থাকা মানুষও রাজনীতিতে আসতে পারে এমন আশা তৈরি করেছিল জুলাই আন্দোলন।
তিনি বলেন, প্রকৃত রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি হতে সময় লাগবে। কিন্তু আশা এখনো আছে।
২৫ বছর বয়সী ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী এইচ এম আমিরুল করিম বলেন, এখন না হলেও ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর স্বপ্ন বাস্তব হবে। আমি হাল ছাড়তে প্রস্তুত নই।





