‎কয়েক মিনিটের ঝড়, কৃষকের দীর্ঘশ্বাস

Date:

spot_img

‎
‎মো. সাইফুল ইসলাম
‎
‎কয়েক মিনিটের একটি ঝড়। অথচ সেই কয়েক মিনিটেই টাঙ্গাইলের মধুপুরের বহু কৃষকের কয়েক মাসের শ্রম, বিনিয়োগ ও স্বপ্ন যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। বুধবারের আকস্মিক ঝড়ে উপজেলার পাহাড়ি এলাকার শোলাকুড়ী, ফুলবাগচালা, অরণখোলা, ভুটিয়া ও কুড়াগাছাসহ বিভিন্ন এলাকায় কলা, পেঁপে, আনারস ও সবজির বাগান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২৭ হেক্টর কলা ও ২৬ হেক্টর পেঁপের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। হিসাবের বাইরে থাকা ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
‎
‎সংবাদটি পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু হলেও এর ভেতরের গল্পটি আসলে মানুষের। একটি কলাগাছ ভেঙে পড়া মানে শুধু একটি গাছের মৃত্যু নয়; এর সঙ্গে ভেঙে পড়ে একজন কৃষকের প্রত্যাশা। একটি পেঁপের বাগান মাটিতে লুটিয়ে পড়া মানে শুধু ফলন কমে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে মাটিতে মিশে যায় পরিবারের খরচের হিসাব, সন্তানের পড়াশোনার স্বপ্ন, ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরিকল্পনা কিংবা ঘরের প্রয়োজন মেটানোর আশ্বাস।
‎
‎কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে গাছের পরিচর্যা করেছেন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে কাজ করেছেন। অনেকেই সঞ্চয়ের টাকা খরচ করেছেন, কেউ কেউ ধারদেনা করে বাগান করেছেন। ফসল ঘরে তোলার সময় যখন প্রায় দরজায় কড়া নাড়ছিল, ঠিক তখনই প্রকৃতির নির্মম আঘাত। কয়েক মিনিটের ঝড় তাদের বুঝিয়ে দিল—কৃষকের জীবন কতটা অনিশ্চিত, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
‎
‎আমরা কৃষকের উৎপাদন দেখি, বাজারে ফসল দেখি, দামের ওঠানামা দেখি; কিন্তু সেই উৎপাদনের পেছনে থাকা কৃষকের অনিশ্চয়তাকে কতটা দেখি? একটি ফসল নষ্ট হলে বাজারে তার প্রভাব পড়ে, কিন্তু কৃষকের ঘরে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তার হিসাব কোনো বাজারদরে ধরা পড়ে না। কৃষকের ক্ষতি কেবল টাকার ক্ষতি নয়—এটি তার সময়, শ্রম, ঘাম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষতি।
‎
‎মধুপুরের এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, কৃষি শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই, বাজারদরের পতন কিংবা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিটি ধাক্কা কৃষককে আরও অসহায় করে তোলে। অথচ খাদ্য উৎপাদনের মূল দায়িত্ব যাদের কাঁধে, দুর্যোগের সময় তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট নয়।
‎
‎এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো। মাঠপর্যায়ে দ্রুত ও নির্ভুল ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করতে হবে। ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সরকারি সহায়তা, প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মাঠে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে হবে—কোন গাছ বাঁচানো সম্ভব, কীভাবে অবশিষ্ট ফসল রক্ষা করা যায়, কীভাবে দ্রুত নতুন করে চাষে ফেরা যায়।
‎
‎কারণ দুর্যোগের পর কৃষকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু আর্থিক সহায়তা নয়—আবার দাঁড়ানোর সুযোগ।
‎
‎মধুপুরের মাটিতে আজ অসংখ্য ভাঙা কলাগাছ পড়ে আছে। ঝড়ে উপড়ে যাওয়া গাছগুলোর পাশে হয়তো দাঁড়িয়ে আছেন কোনো কৃষক—নীরবে তাকিয়ে আছেন তার মাসের পর মাসের পরিশ্রমের দিকে। সেই নীরবতার ভাষা হয়তো সংবাদপত্রের কোনো সংখ্যায় পুরোপুরি লেখা সম্ভব নয়।
‎
‎তবু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই নীরব কান্না শুনতে পাওয়া।
‎
‎প্রকৃতির ঝড় মানুষ থামাতে পারে না। কিন্তু ঝড়ের পর একজন কৃষক যেন একা না থাকেন—এটি নিশ্চিত করা মানুষের, সমাজের এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কয়েক মিনিটের ঝড়ে যদি কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে যায়, তবে সেই স্বপ্ন জোড়া লাগানোর দায়িত্বও আমাদেরই নিতে হবে।
‎
‎মধুপুরের কৃষকের ভাঙা বাগান তাই শুধু একটি স্থানীয় দুর্যোগের ছবি নয়; এটি আমাদের কৃষকের অনিশ্চিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। আজ তাদের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি বাগানকে সহায়তা করা নয়—এটি দেশের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তিকে রক্ষা করা।
‎
‎ঝড় চলে গেছে। কিন্তু কৃষকের সামনে এখন আরও বড় পরীক্ষা—তিনি আবার কীভাবে দাঁড়াবেন।
‎
‎এই প্রশ্নের উত্তর যেন কৃষককে একা খুঁজতে না হয়।
‎

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...