সংসদ নির্বাচন: প্রতীক বরাদ্দ শেষ, চূড়ান্ত লড়াইয়ে ১,৯৬৭ প্রার্থী — তবুও ‘নির্বাচন হবে তো?’ প্রশ্ন উঠছে কেন

Date:

spot_img

বিশেষ প্রতিনিধি

গতকাল সারা দেশে প্রতীক বরাদ্দ শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আজ সময়সূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার থেকেই প্রার্থী ও দলগুলো নামবে পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারে। অর্থাৎ ভোটের মাঠে শুরু হচ্ছে চূড়ান্ত লড়াই। বাসস জানিয়েছে, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখন মোট ১,৯৬৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ২৯৮ আসনে এই লড়াই (পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসন বাদে)। তফসিল অনুযায়ী ভোটগ্রহণ ও গণভোটের দিন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু প্রচারের দরজায় দাঁড়িয়েও রাজধানী থেকে জেলা শহর—আড্ডা, ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, এমনকি সংবাদকর্মীদের সামনেও ঘুরে ফিরে উঠছে, প্রভাবশালী গণমাধ্যম বিবিসির শিরোনামে ও একটি প্রশ্ন: নির্বাচনটা আসলেই হবে তো?

নির্বাচন কি আসলেই হবে- এই প্রশ্ন এখনো কেন উঠছে

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন সামনে—তবু ‘হবে কি হবে না’ এই সংশয় সাধারণ মানুষের কথাবার্তায় বারবার ফিরে আসছে। অনেকেই সংবাদকর্মীদের কাছে গত কয়েকদিন ধরে এই প্রশ্ন করেছেন পরিচিত-অপরিচিত নানা জন। বিশ্লেষকদের এক অংশের ব্যাখ্যা—সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং নির্বাচন আয়োজন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে শুরু থেকেই যে ধরনের শৈথিল্য দেখা গেছে, সেটি পুরোপুরি কাটেনি বলেই জনমনে সন্দেহ জমেছে। আবার অন্য একটি অংশ এটিকে ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও সমর্থকদের গুজব বা প্রোপাগান্ডা হিসেবেও দেখছেন। বিবিসি বাংলা আরও বলছে, দুর্বল আইনশৃঙ্খলার কারণে যদি নির্বাচনী সহিংসতা বাড়ে, সেটিও নির্বাচন বানচালের আশঙ্কাকে জোরালো করতে পারে।

সংশয়ের কারণ কী

নির্বাচন কমিশন গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা করার পর সরকার ও ইসি ধারাবাহিকভাবে নানা প্রস্তুতি পদক্ষেপ নিচ্ছে—এ কথাও বিবিসি তুলে ধরেছে। কিন্তু যাঁরা সংশয়ের কথা বলছেন, তাঁদের কেউ কেউ জানিয়েছেন ‘আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি’ দেখেই তাঁরা এমন অনুমান করছেন। কারও যুক্তি—যে ধরনের তৎপরতা সাধারণত নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান হয়, তা এখনো পর্যাপ্তভাবে চোখে পড়ছে না। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘সরকারের আনুকূল্য পাওয়া’ কিছু গোষ্ঠী নির্বাচন ঠিকমতো হতে দেবে না—এমন আশঙ্কাও কিছু মহলে শোনা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে এসেছে।

সরকারের বক্তব্য কী

এই সংশয়ের প্রেক্ষাপটে সরকারের ভাষ্যও স্পষ্টভাবে এসেছে বিবিসি বাংলায়। ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, “পতিত স্বৈরাচারের দোসররা দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে কনফিউশন (সংশয়) ছড়াতে ব্যস্ত।” এর আগে তিনি বলেছিলেন, নির্ধারিত দিনেই নির্বাচন হবে এবং সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে নির্বাচন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও বিভিন্ন বৈঠক-সাক্ষাতে একই বার্তা দিয়েছেন—১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে, এক দিন আগে বা পরে নয়। সরকার পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুয়া খবর ও পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে; তবে নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন আয়োজন ও ফল ঘোষণার পর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় ‘টেনশন পয়েন্ট’ হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের বক্তব্যে এসেছে—মব সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতার ধারণা, এবং পুলিশ-প্রশাসনের পর্যাপ্ত সক্রিয়তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকলে ভোটার কেন্দ্রে যাবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং বর্তমান প্রস্তুতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। বৈঠকে আরও জানানো হয়েছে—সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা কমিটি করা হয়েছে, এবং নির্বাচনদিন প্রতি কেন্দ্রে কমপক্ষে ১৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থাকার কথা।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান

রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন নিয়ে বড় কোনো সংশয়ের কথা সামনে আসেনি। বরং মনোনয়নপত্র দাখিল-প্রত্যাহার পর্ব পেরিয়ে প্রতীক বরাদ্দের পর প্রচারের চূড়ান্ত ধাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তার দল বিশ্বাস করে নির্বাচন কমিশন যোগ্যতার সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দলের সভা-সমাবেশ ও প্রচার শুরুর ঘোষণাও এসেছে। অর্থাৎ মাঠে প্রস্তুতির দৃশ্যমান ছবি যতই স্পষ্ট হচ্ছে, জনমনে ‘হবে তো?’ সংশয়ের সুর ততই একেবারে থামছে না—এ দ্বন্দ্বটাই এখন নির্বাচন-আলোচনার কেন্দ্রে।

চূড়ান্ত লড়াইয়ে ১,৯৬৭ প্রার্থী

বাসসের তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ আসনে মোট ২,৫৮৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ১,৮৫৮ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ৭২৬ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়। পরে ৬৩৯ জন আপিল করলে আপিলে ৪৩১ জন প্রার্থিতা ফিরে পান। সবশেষে ৩০৫ জন প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় এখন প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়েছে ১,৯৬৭ জনে। বাসস আরও জানায়, ভোটগ্রহণ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত—ব্যালট পেপারে, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে; একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট।

শেষ কথা হলো—প্রতীক বরাদ্দ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন এখন কাগজে-কলমে আর ‘প্রস্তুতির ধাপ’ নয়, প্রচারের দৌড়। তবু যে প্রশ্নটা বারবার ভেসে ওঠে—নির্বাচন হবে তো?—তার উত্তর খুঁজতে মানুষ তাকিয়ে আছে মূলত দুই দিকে: আইনশৃঙ্খলা ও মাঠের বাস্তব পরিবেশ, আর রাষ্ট্রযন্ত্রের দৃশ্যমান প্রস্তুতি—যা একদিকে ভোটের উত্তাপ বাড়াবে, অন্যদিকে সংশয়ের কুয়াশা কাটাবে কি না, তা-ই আগামী দিনের বড় পরীক্ষা।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...