
রংপুরের হাট-বাজারগুলোতে বাঁশের কুলা-ডালা এখন স্মৃতি, দখলে প্লাস্টিক
রংপুর ব্যুরো
একসময় গ্রামীণ বাংলার প্রতিটি ঘরেই ছিল বাঁশের তৈরি কুলা, ডালা, ঝুড়ি, চালুন, চাটাই ও মোড়া। কৃষকের উঠানে ধান ঝাড়াই-বাছাই থেকে শুরু করে মাছ ধরার কাজে পলো, ডার্কি ও খলই—নিত্যপ্রয়োজনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল বাঁশের তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার। সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র বদলে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক ও নানা কৃত্রিম উপকরণের বাহারি পণ্য বাজার দখল করায় ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প। একই সঙ্গে সংকটে পড়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারিগরদের জীবন-জীবিকা।
একসময় রংপুরের আট উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কারিগররা বাঁশের তৈরি এসব পণ্য নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারেও নিয়মিত বসত বাঁশের তৈরি সামগ্রীর পসরা। বদরগঞ্জ হাট, নাগেরহাট, ছড়ান হাট, গুটিবাড়ী হাট, শ্যামপুর হাট, পদাগঞ্জ হাট, শুকরের হাট, তারাগঞ্জ হাট, মিঠাপুকুর হাট, শানেরহাট, পীরগঞ্জ হাট, পাওটানারহাট, পীরগাছা হাট, বেতগাড়ী হাট, লালবাগ হাট, মমিনপুর হাট, লালদিঘীর হাট, কাউনিয়া হাট ও গংগাচড়া হাটসহ জেলার বিভিন্ন ছোট-বড় হাটে এসব পণ্যের বেচাকেনা ছিল চোখে পড়ার মতো। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
বাঁশের তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব হলেও প্লাস্টিকের তুলনামূলক কম দাম, সহজলভ্যতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এখন প্লাস্টিকের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে বাঁশের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কমেছে কারিগরদের আয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচ-ছয় বছর আগেও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের বেশ ভালো চাহিদা ছিল। তখন একটি ডালি বিক্রি হতো ৫০ থেকে ৮০ টাকা, কুলা ৫০ টাকা, মাছ ধরার ডার্কি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, চাটাই ৫০ থেকে ১০০ টাকা, ডালা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, চালুন ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ঝুড়ি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, মোড়া ১০০ টাকা, খলই ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, মুরগির খাঁচা ৬০ থেকে ১০০ টাকা, মই ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, ধানের গোলা ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা, ওড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং বাঁশের তৈরি খেলনা ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হতো।
বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর হাট এলাকার বাঁশশিল্পী রফিকুল মিয়া বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে যে বাঁশ কিনতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা লাগত, এখন সেই বাঁশ কিনতেই ২৫০ থেকে ৩০০, এমনকি ৪০০ টাকা পর্যন্ত লাগে। এত টাকা দিয়ে বাঁশ কিনে পণ্য তৈরি করে বিক্রি করার পর অনেক সময় বাঁশের দামই ওঠে না। ফলে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আগে এলাকায় অনেক বাঁশঝাড় ছিল। এখন বাড়িঘর নির্মাণ ও বিভিন্ন কারণে বাঁশঝাড় কমে গেছে। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় বাঁশের উৎপাদন বাড়েনি। ফলে কাঁচামালের দাম বাড়ছে, আর আমাদের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে।’ কারিগরদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁশের একটি পণ্য তৈরি করতে শুধু কাঁচামাল হলেই হয় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের শ্রম ও নিপুণ কারিগরি। বাঁশ সংগ্রহের পর তা কেটে, চিরে, শুকিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী আকৃতি দিতে হয়। এরপর হাতের দক্ষতায় তৈরি করতে হয় কাঙ্ক্ষিত পণ্য। কিন্তু সেই শ্রম ও সময়ের তুলনায় বাজারে ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও পণ্যের দাম সেভাবে বাড়ছে না।
এদিকে প্লাস্টিকের পণ্যের দাপটে বদলে গেছে গ্রামীণ বাজারের চিত্রও। একসময় যে হাটে বাঁশের তৈরি ডালা, কুলা, ঝুড়ি, চালুন, চাটাই, মোড়া কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জামের সারি দেখা যেত, সেখানে এখন প্লাস্টিকের তৈরি নানা রঙের পণ্যই বেশি চোখে পড়ে। দামে তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ক্রেতারাও সহজেই এসব পণ্যের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। একসময় এ উপজেলার প্রায় প্রতিটি ঘরে শোভা পেত বাঁশের তৈরি কুলা, চালুন, ঝুড়ি, ডালা, চাটাই ও মোড়া। ধান রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো বাঁশের গোলা। মাছ ধরার জন্য ছিল পলো, ডার্কি ও খলই। মুরগির খাঁচা থেকে মই, খেলনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সজ্জাসামগ্রীও তৈরি হতো বাঁশ দিয়ে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এসব পণ্যের অনেকটাই এখন জায়গা করে নিয়েছে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি সামগ্রী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাঁশশিল্পের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। পর্যাপ্ত পুঁজির সংকট, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়া, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং বাজারে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক বিস্তার এ শিল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি বাঁশঝাড় কমে যাওয়ায় কাঁচামালের সংকটও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অথচ বিক্রয়মূল্য ও লাভ বাড়ছে না। তারপরও বাপ-দাদার পেশা ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো কিছু কারিগর বাঁশশিল্পকে আঁকড়ে ধরে আছেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা দিনের পর দিন বাঁশ কেটে, চিরে ও বুনে তৈরি করে চলেছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। তবে তাঁদের অনেকেরই আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী প্রজন্ম এ পেশায় আর আগ্রহী হবে না। পাশাপাশি এই পেশা ছিলো বলে তারা এটাও জানতে পারবে না শুধু স্মৃতির পাতায় থাকবে।
আঞ্চলিক শ্রম দপ্তর, রংপুরের উপপরিচালক তুষার কান্তি রায় বলেন, বাঁশশিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের দক্ষতা ও শ্রম গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঐতিহ্যবাহী এ পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের টিকিয়ে রাখতে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে কারিগররা নিজেদের পেশায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত থাকতে পারবেন।বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), রংপুরের শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, বাঁশ দিয়ে তৈরি পণ্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ঐতিহ্যবাহী একটি অংশ। এ শিল্পকে টেকসই করতে কারিগরদের আধুনিক নকশা ও পণ্য তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ, মানোন্নয়ন এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা বাড়াতে নতুন বাজার খুঁজে বের করার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়দের মতে, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবহার বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে তার সঙ্গে দেশীয় ঐতিহ্যের বাহক বাঁশের তৈরি পণ্যের বাজারও টিকিয়ে রাখা জরুরি। কারণ বাঁশশিল্পের সঙ্গে শুধু কয়েকটি পণ্য নয়, জড়িয়ে আছে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রা, কারিগরি দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং বাজারজাতকরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে রংপুরের হারিয়ে যেতে বসা বাঁশশিল্প নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে। নইলে প্লাস্টিকের বাহারি পণ্যের ভিড়ে একদিন হয়তো শুধু বাঁশের তৈরি পণ্যই নয়, হারিয়ে যাবে গ্রামীণ বাংলার জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা একটি প্রাচীন শিল্পঐতিহ্যও।





