
রেহানা ফেরদৌসী
কিছুদিন আগে পারিবারিক ছুটি কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বারের মতো দাঁড়ালাম স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে। দূর থেকে দেখা সেই বিশাল অবয়ব, আকাশের দিকে উঁচিয়ে ধরা মশাল আর হাতে ধরা ফলক—সবকিছুই পরিচিত, অথচ এবার যেন নতুন করে দেখলাম। পর্যটকের চোখে নয়, একজন লেখকের চোখে।
মশালটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো—এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি একটি আদর্শের প্রতীক। স্বাধীনতা, মর্যাদা, গণতন্ত্র, আশা—সময়ের সঙ্গে এই শব্দগুলো স্ট্যাচু অব লিবার্টির অর্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু সেই আদর্শের পাশে দাঁড়িয়ে বর্তমানের আমেরিকাকে দেখলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—আজকের অভিবাসন বাস্তবতার সঙ্গে স্ট্যাচু অব লিবার্টির বহন করা সেই মানবিক আদর্শের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকাতে হয়।

স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন। ফরাসি ভাস্কর ফ্রেদেরিক অগুস্ত বারথোলদি এর নকশা করেন এবং ১৮৮৬ সালে নিউইয়র্ক হারবারে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। অর্থাৎ, এর মূল ঐতিহাসিক ভাবনা ছিল স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আদর্শকে উদ্যাপন করা; শুরু থেকেই এটি কেবল অভিবাসীদের জন্য নির্মিত কোনো স্মৃতিস্তম্ভ ছিল না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্ট্যাচু অব লিবার্টির অর্থ আরও বিস্তৃত হয়। ১৮৮৩ সালে কবি এমা ল্যাজারাস লেখেন তার বিখ্যাত কবিতা The New Colossus। ১৯০৩ সালে কবিতাটির অংশ স্ট্যাচুর পাদদেশে স্থাপিত ফলকে যুক্ত করা হয়। কবিতায় স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে ‘Mother of Exiles’—অর্থাৎ নির্বাসিত ও আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতীকী আশ্রয়দাত্রী হিসেবে কল্পনা করা হয়। একই সময়ে কাছের Ellis Island হয়ে ওঠে অভিবাসীদের প্রবেশ ও যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে স্ট্যাচু অব লিবার্টি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার পাশাপাশি অভিবাসন, আশ্রয়, সুযোগ ও নতুন জীবনের প্রত্যাশার এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে নিউইয়র্ক বন্দরে আসা অসংখ্য অভিবাসীর কাছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি ছিল আমেরিকায় পৌঁছানোর প্রথম দৃশ্যমান প্রতীক। তাদের কাছে উঁচিয়ে ধরা মশালটি শুধু আলো ছিল না—ছিল নতুন জীবনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত। তবে সেই অভিজ্ঞতাও সব মানুষের জন্য এক ছিল না। Ellis Island ছিল কারও কাছে ‘Island of Hope’, আবার কারও জন্য ‘Island of Tears’; কারণ সবাইকে আমেরিকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো না।
এই ইতিহাসই বর্তমানের প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আজকের যুক্তরাষ্ট্র একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার নিজস্ব সীমান্ত, নিরাপত্তা ও অভিবাসননীতি নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। অনিয়মিত অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা, ভিসা জালিয়াতি, সন্ত্রাসবাদ বা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি রাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা নিতেই পারে। তাই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে মানবিকতার বিরোধিতা হিসেবে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, রাষ্ট্রের নীতির মানবিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও সমাজের আছে।
বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও ভিসা ব্যবস্থায় নানা ধরনের কঠোরতা, প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞা এবং বাড়তি যাচাই-বাছাই দেখা যাচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর ভিসা ও প্রবেশসংক্রান্ত বিধিনিষেধ, সীমান্তনিরাপত্তা জোরদার করা এবং বিদেশি শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন ভিসাপ্রার্থীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই—এসবই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের যুক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
কিন্তু এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়, সেটিও উপেক্ষা করার নয়। বিশেষ করে যারা উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান কিংবা উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকে, তাদের কাছে প্রবেশের প্রক্রিয়া যখন আরও কঠিন ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তখন স্ট্যাচু অব লিবার্টির প্রতীকী বার্তাটিও নতুন করে আলোচনায় আসে।
একদিকে মশাল বলছে স্বাধীনতা, আশা ও সম্ভাবনার কথা; অন্যদিকে অভিবাসন বাস্তবতা বলছে সীমান্ত, যাচাই, নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তার কথা। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দূরত্বটিই কি আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়?
তবে এই প্রশ্নের অর্থ আমেরিকাকে অভিযুক্ত করা নয়।
কারণ আমেরিকার বাস্তবতা একমাত্র অভিবাসননীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষও দীর্ঘদিন ধরে দেশটির জ্ঞান, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। আমেরিকার এই বহুমাত্রিক সাফল্যকে অস্বীকার করে স্ট্যাচু অব লিবার্টির অর্থ বোঝা সম্ভব নয়।
বরং প্রশ্নটি আরও গভীর।
একটি রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা রক্ষা করবে—এটি যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি তার ইতিহাস ও প্রতীক যে মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে, সেগুলোর সঙ্গেও একটি নৈতিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা কি জরুরি নয়?
স্ট্যাচু অব লিবার্টির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। এটি কোনো নিখুঁত পৃথিবীর ঘোষণা নয়; বরং একটি আদর্শের স্মারক। তার মশাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের সীমানা থাকতে পারে, নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকতে পারে, আইন ও নিয়ম থাকতে পারে; কিন্তু সেই সবকিছুর মধ্যেও মানুষের মর্যাদা, ন্যায় ও আশার জায়গাটি যেন হারিয়ে না যায়।
নিউইয়র্ক থেকে ফিরে তাই স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে আমার কাছে শুধু একটি দর্শনীয় স্থাপনা মনে হয়নি। মনে হয়েছে, এটি যেন আমেরিকার ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমানের প্রতিও একটি নীরব প্রশ্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে—স্বাধীনতার যে আলো পৃথিবীকে দেখানোর জন্য মশালটি জ্বালানো হয়েছিল, সেই আলো কি আজও সবার জন্য সমানভাবে দৃশ্যমান?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া সহজ নয়। কারণ অভিবাসনের বাস্তবতা যেমন জটিল, তেমনি একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মানবিক দায়বদ্ধতার ভারসাম্যও সহজ নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা সামরিক সক্ষমতায় নয়; তার মূল্যবোধ কতটা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়, তার মধ্যেও সেই শক্তির পরিচয় থাকে।
স্ট্যাচু অব লিবার্টির মশাল তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—এটি বর্তমানের জন্যও এক আলোকচিহ্ন। সেই আলো যেন স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা, ন্যায় ও আশার পথকে আরও উজ্জ্বল করে।
লেখক পরিচিতি: রেহানা ফেরদৌসী
রেহানা ফেরদৌসী একজন কলামিস্ট ও ভয়েস আর্টিস্ট। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ও সাময়িকীতে নিয়মিত কলাম লিখেন, যেখানে সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন নিয়ে সহজভাবে কথা বলেন।তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।তিনি বিশ্লেষণধর্মী লেখা,সমসাময়িক সমাজ, সংকট ও নানামুখী সমস্যাবলিকে গভীর পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেন। তাঁর লেখায় বাস্তবতা, সচেতনতা ও চিন্তার গভীরতার সুষম প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে আবৃত্তি ও তথ্যচিত্রে তাঁর কণ্ঠস্বর শ্রোতাদের কাছে পরিচিত ও সমাদৃত।
তিনি কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সমাজকল্যাণ বিভাগের সহসভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং নারীর কল্যাণে কাজ করছেন।





