মানবিকতার সীমান্তে এক নারীর প্রশ্ন

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

ধর্মান্তর, প্রেম, বিয়ে- এ তিন শব্দ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে কখনোই কেবল ব্যক্তিগত থাকে না। ভারতীয় নারী সরবজিৎ কউর, যিনি পাকিস্তানে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নূর ফাতিমা নামে পরিচিত হন এবং পাকিস্তানি নাগরিক নাসির হুসেনকে বিয়ে করেন। তার ভবিষ্যৎ এখন কেবল একজন নারীর ভাগ্য নয় বরং মানবিকতা, আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের এক জটিল পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এখন যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা সরল কিন্তু গভীর। একজন নারী, যিনি স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়েছেন এবং বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছেন, তাকে কি কেবল ভিসার শর্তের কারণে ফেরত পাঠানো উচিত? নাকি রাষ্ট্রকে মানবিক বিবেচনায় আরও এক ধাপ এগোতে হবে?

সরবজিৎ কউর শিখ তীর্থযাত্রার অংশ হিসেবে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। প্রথম শিখ ধর্মগুরু গুরু নানক দেবের জন্মোৎসব উপলক্ষে। ধর্মীয় ভিসার নির্দিষ্ট সময় শেষ হলেও তিনি ভারতে ফেরেননি। এরপর ইসলাম গ্রহণ ও বিয়ে। এই ঘটনাপ্রবাহ একদিকে যেমন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সংখ্যালঘু বিষয়ক বিতর্ককে উসকে দিয়েছে তেমনি অন্যদিকে ভারতের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়েও ইসলামাবাদের বক্তব্যকে সামনে এনেছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর বক্তব্যে স্পষ্ট- ভারতে মুসলমানদের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরবজিৎ কউরকে ফেরত পাঠানো মানবিক হবে কি না, তা নতুন করে ভাবা হচ্ছে। এই বক্তব্য নিছক প্রশাসনিক নয়। এটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বয়ানের অংশ, যেখানে প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতিকে নৈতিক যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

তবে প্রশ্ন এখানেই শেষ নয়। ধর্মীয় ভিসা কি কেবল আনুষ্ঠানিক যাতায়াতের অনুমতি, নাকি তা একজন মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার পথও খুলে দিতে পারে? পাকিস্তানের শিখ সম্প্রদায়ের একাংশ বলছে, এই ঘটনা ধর্মীয় তীর্থযাত্রার পবিত্রতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ভিসার শর্ত ভঙ্গ হলে আইনের শাসন কোথায় দাঁড়াবে। সে প্রশ্নও উঠছে জোরালোভাবে।

লাহোর হাইকোর্টের ভূমিকা এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। আদালত সরবজিৎ কউরকে হয়রানি না করার নির্দেশ দিয়েছে, যা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নারীর অধিকার প্রশ্নে এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু একই সঙ্গে আদালতও বলেছে- চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত প্রয়োজন। অর্থাৎ মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ- দুটোই সমানভাবে বিবেচ্য।

এই ঘটনায় সবচেয়ে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন স্বয়ং সরবজিৎ কউর। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন, স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন। যদি সেটিই সত্য হয়, তবে রাষ্ট্রের কাজ কি তাকে সুরক্ষা দেওয়া নয়? আবার রাষ্ট্র যদি ভিসা আইন শিথিল করে, তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনাগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে—সেই প্রশ্নও অস্বীকার করা যায় না।

দৈনিক মুখপাত্রের দৃষ্টিতে, সরবজিৎ কউরের ঘটনা আমাদের সামনে একটি বড় বাস্তবতা তুলে ধরে—দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্র, ধর্ম ও ব্যক্তিস্বাধীনতা এখনো একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে। সীমান্তের কাঁটাতার মানুষের অনুভূতি বোঝে না কিন্তু রাষ্ট্রকে সেই অনুভূতির দায় নিতে হয়।

শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদ যে সিদ্ধান্তই নিক, তা কেবল একজন নারীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। বরং এটি বলে দেবে, মানবিকতা কি এখনও রাষ্ট্রনীতির ভাষায় জায়গা পায়, নাকি সবকিছুই আইন ও কূটনীতির কঠোর অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে।

১৩ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক এই আমার দেশ, THE BUSINESS in Magazine, প্রধান সম্পাদক দৈনিক মুখপাত্র

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...