মোজাফফরের ফোনে জিয়া হত্যার ৪৫ বছরের রহস্যের নতুন সূত্র

Date:

spot_img

দেশ বিদেশের যোগাযোগ, গোপন নথি ও মঞ্জুরের মৃত্যু তদন্তে

১৯৮১ সালের অপ্রকাশিত অনুসন্ধান প্রতিবেদনেও ছিল গোপন কাগজ খোঁজার তথ্য

নাছির উদ্দিন লিটন

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর নতুন করে সামনে আসছে এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর মেলেনি চার দশকেরও বেশি সময়ে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. মোজাফফর হোসেনের ডিজিটাল যোগাযোগ, তাঁর দেশে ফেরার পথ, দেশ ও বিদেশে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, কার আশ্রয়ে তিনি অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর আর্থিক লেনদেনের পেছনে কারা ছিলেন, এসব এখন তদন্তকারীদের নজরে। বিশেষ প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসসহ সংশ্লিষ্ট স্থান পরিদর্শনের পর তদন্তে নতুন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ডিজিটাল যোগাযোগ। তবে মোজাফফরের সন্ধান পাওয়ার গল্পের শুরু হয়েছিল অন্য একটি ফোন থেকে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মুঠোফোন ফরেনসিক বিশ্লেষণের সময় কয়েকটি সন্দেহজনক নম্বর পাওয়া যায়। ২০২৩ সাল থেকে বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে ওই নম্বরগুলো ব্যবহার করে মাসুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছিল। সিমগুলো ভিন্ন নামে নিবন্ধিত ছিল। পুলিশ পরে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে ওই যোগাযোগের সঙ্গে মোজাফফরের যোগসূত্র শনাক্ত করে।

এরপর ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে ৭৭ বছর বয়সী মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরদিন তাঁকে মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পরে জানান, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্যমান সামরিক আইনে জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগোবে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সূত্রে বলা হয়, ১৯৮১ সালের ঘটনার পর গঠিত কোর্ট অব ইনকোয়ারি মোজাফফরের বিরুদ্ধে সামরিক বিচারের সুপারিশ করেছিল, কিন্তু তিনি আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় সে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।

এখন মোজাফফরের নিজের ডিজিটাল জগৎ

মোজাফফরকে শনাক্ত করার সূত্র এসেছিল অন্যের ফোন থেকে। কিন্তু এখন তাঁর নিজের ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্কই তদন্তের বড় ক্ষেত্র। গত ৫ আগস্ট তাঁর ফেসবুক ও মেসেঞ্জারের তথ্য চেয়ে মেটার কাছে চিঠি পাঠানোর কথা জানিয়েছিল প্রসিকিউশন। তদন্তকারীরা মুছে ফেলা কথোপকথনসহ ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।

বিশেষ প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার ভাষ্য অনুযায়ী, মোজাফফরের সঙ্গে দেশের ভেতর ও বাইরের বেশ কিছু ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, দীর্ঘ ৪৫ বছর পরও কেন ওই ব্যক্তিরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন, তিনি কীভাবে বাংলাদেশে ফিরলেন, কে তাঁকে আশ্রয় দিল এবং তাঁর ব্যাংক লেনদেনে কারা সহায়তা করেছে। তবে এসব যোগাযোগ কোনো রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। ফলে এই পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দায় নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।

১৯৮১ সালের কমিশনেই ছিল ‘গোপন কাগজের’ কথা

বর্তমান তদন্তে সবচেয়ে আলোচিত নতুন প্রশ্নগুলোর একটি হলো জিয়াউর রহমানের কাছে থাকা কথিত একটি গোপন নথি। বিশেষ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, হত্যার পর একটি গোপন কাগজ খোঁজার চেষ্টা হয়েছিল বলে তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে। নথিটি কী ছিল এবং কেন সেটির প্রতি হামলাকারীদের আগ্রহ ছিল, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বিষয়টি পুরোপুরি নতুন নয়। ১৯৮১ সালে গঠিত সরকারি অনুসন্ধান কমিশনের দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকা প্রতিবেদনটি চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশ করে দ্য ডেইলি স্টার। ওই নথিতে বলা হয়, জিয়া নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তিনজন মেজর ও কয়েকজন সেনাসদস্য সার্কিট হাউসে এসে সেখানে থাকা দুই এনএসআই কর্মকর্তাকে অস্ত্রের মুখে নিয়ে রাষ্ট্রপতির কক্ষে প্রবেশ করেন। তাঁরা ‘সিক্রেট পেপারস’ সম্পর্কে জানতে চান এবং কক্ষ তল্লাশি করেন। একই প্রতিবেদনে ‘মেজর মোজাফফর’ নামের একজনকে রাষ্ট্রপতির বিছানার চাদর আনতে বলা হয়েছিল এবং পরে মরদেহ চাদরে মুড়ে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের উল্লেখ রয়েছে।

এ তথ্য বর্তমান তদন্তে গোপন নথির প্রসঙ্গকে বিশেষ তাৎপর্য দিচ্ছে। অর্থাৎ ৪৫ বছর পর যে প্রশ্নটি আবার উঠেছে, তার উল্লেখ ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই তৈরি সরকারি অনুসন্ধান নথিতে ছিল।

কেন ষড়যন্ত্রের প্রশ্নটির উত্তর মেলেনি

১৯৮১ সালের অনুসন্ধান কমিশনের নথিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। ৬ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার যে কমিশন গঠন করেছিলেন, তার প্রাথমিক কার্যপরিধিতে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ষড়যন্ত্র ছিল কি না, কারা ষড়যন্ত্রকারী, উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কারা সহায়তা করেছিল, এসব অনুসন্ধানের কথা ছিল। কিন্তু ১৩ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংশোধনীতে সেই অংশটি কমিশনের কার্যপরিধি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর কমিশনের কাজ মূলত রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং মরদেহ রক্ষায় প্রশাসনিক ভূমিকা পরীক্ষা করার মধ্যে সীমিত হয়ে যায়।

ফলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সম্ভাব্য বৃহত্তর ষড়যন্ত্র, উদ্দেশ্য এবং নির্দেশদাতাদের প্রশ্ন সেই কমিশনের চূড়ান্ত অনুসন্ধানের কেন্দ্রে আর থাকেনি। বর্তমান পুনঃতদন্তে সেই পুরোনো শূন্যস্থানই আবার সামনে আসছে।

জিয়াকে কে গুলি করেছিলেন

আরেকটি বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন, জিয়াউর রহমানকে ঠিক কে বা কারা গুলি করেছিলেন। বিভিন্ন বই, স্মৃতিচারণ ও গণমাধ্যমের বর্ণনায় একাধিক নাম এসেছে। তবে সেগুলোর সবকটি একই কথা বলে না।

১৯৮১ সালের অনুসন্ধান কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ মে ভোরে সার্কিট হাউসে হামলার সময় জিয়াউর রহমান কক্ষের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে জানতে চান হামলাকারীরা কী চায়। এরপর খুব কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে তিনি নিহত হন। ময়নাতদন্তে তাঁর শরীরে ২০টি পৃথক গুলির ক্ষতের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু কমিশনের প্রকাশিত অংশে নির্দিষ্ট করে কে ট্রিগার টেনেছিল, তা চিহ্নিত করা হয়নি।

অন্যদিকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় মোজাফফরসহ একাধিক কর্মকর্তার উপস্থিতির কথা পাওয়া যায়। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বহুল আলোচিত বর্ণনায় আবার হত্যাকাণ্ডের মুহূর্ত নিয়ে ভিন্ন বিবরণ রয়েছে। ফলে বর্তমান তদন্তকারীরা জীবিত সেনা কর্মকর্তা, তাঁদের তৎকালীন জুনিয়র, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ নথি এবং আন্তর্জাতিক সূত্র একত্র করে ঘটনাটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।

মঞ্জুরের মৃত্যু নিয়েও নতুন প্রশ্ন

জিয়া হত্যার তদন্তের সঙ্গে আবার সামনে এসেছে তৎকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের মৃত্যুর ঘটনাও। জিয়া হত্যার পর মঞ্জুর পুলিশের হাতে আটক হন। পরে তাঁকে সেনাবাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয় এবং এরপর তাঁর মৃত্যু ঘটে।

বিশেষ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, পুলিশ হেফাজত থেকে মঞ্জুরকে কার নির্দেশে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, কোন আইনি ভিত্তিতে তা হয়েছিল, ময়নাতদন্ত কে করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল, এসব প্রশ্নও নতুন তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে জিয়া হত্যার পর সেনানিবাসে ফিরে যাওয়া কর্মকর্তাদের আচরণ এবং পুরো সামরিক বিদ্রোহের উদ্দেশ্যও পুনঃপর্যালোচনা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

৪৫ বছরের পুরোনো নথি ও নতুন প্রযুক্তির মুখোমুখি

জিয়া হত্যার তদন্তে এবার তাই দুটি সময় যেন এক জায়গায় এসে মিলেছে। একদিকে ১৯৮১ সালের সাক্ষ্য, ময়নাতদন্ত, সরকারি অনুসন্ধান কমিশনের নথি এবং সে সময়ের গোয়েন্দা প্রতিবেদন। অন্যদিকে ২০২৬ সালের ফোন ফরেনসিক, কল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লোকেশন ও ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য।

৪৫ বছর আগে যে সরকারি কমিশনের সামনে ‘গোপন কাগজ’ খোঁজার সাক্ষ্য এসেছিল, আজ একই বিষয় আবার তদন্তকারীদের প্রশ্নের তালিকায়। যে মোজাফফরকে তৎকালীন অনুসন্ধান নথিতে রাষ্ট্রপতির মরদেহ সরানোর ঘটনায় উল্লেখ করা হয়েছিল, দীর্ঘ পলাতক জীবনের পর তাঁর গ্রেপ্তার এখন সেই পুরোনো ঘটনার নতুন অনুসন্ধানের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

তবে তদন্ত এখনো চলমান। দেশি বা বিদেশি ব্যক্তি, কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা কিংবা রাজনৈতিক শক্তির সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। মোজাফফরের ডিজিটাল যোগাযোগ থেকে পাওয়া তথ্য আদালতে কতটা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে দাঁড়াবে, সেটিও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই এখনো সেই পুরোনোটিই: ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে শুধু একটি সামরিক বিদ্রোহ ঘটেছিল, নাকি তার পেছনে ছিল আরও বিস্তৃত কোনো পরিকল্পনা? ৪৫ বছর পর নতুন তদন্ত সেই উত্তর খোঁজার আরেকটি সুযোগ তৈরি করেছে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...

বরিশালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউরো স্টার বাস খাদে, শিশুসহ আহত ৫

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি বরিশালের গৌরনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে...

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হলেন চুয়াডাঙ্গার কৃতি সন্তান ডা.মেহেবুব

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত...