‎রংপুরে চালু হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের প্রথম সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Date:

spot_img

‎রংপুর ব্যুরো

‎উত্তরাঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে রংপুর সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। রংপুর নগরীর শালবন মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় প্রায় ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রতিষ্ঠানটি চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, আবাসিক ব্যবস্থা, উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা ও দক্ষ শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু করতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি হবে রংপুরের প্রথম সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে গ্রাফিক ডিজাইন ও আর্কিটেকচার টেকনোলজিতে ৫০ জন করে মোট ১০০ ছাত্রী ভর্তি করা হবে। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ভর্তি কার্যক্রম শেষে আগামী অক্টোবর থেকে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

‎সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থীকে আধুনিক কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের বাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর নগরীর শালবন মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় প্রায় তিন একর জমির ওপর আধুনিক এই ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়েছে। জায়গাটি আগে রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধীনে ছিল। সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় রংপুর ছাড়াও সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হচ্ছে।

‎নতুন ক্যাম্পাসে রয়েছে ছয়তলা একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন এবং চারতলা ছাত্রীনিবাস। ২০০ আসনের ছাত্রীনিবাসে পাঁচটি পৃথক ব্লক রয়েছে। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য রিডিং রুম, টিভি রুম ও ডাইনিং রুমের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য ডরমেটরি, অভ্যন্তরীণ সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সাব-স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে অত্যাধুনিক ওয়ার্কশপ ভবন। সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা হবে। ফলে শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট ট্রেডভিত্তিক ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন শিক্ষার্থীরা।

‎রংপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রথিশ চন্দ্র সেন জানান, প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ আগামী অক্টোবরের মধ্যে পুরোপুরি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অবকাঠামোগত সব সুবিধা শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।এদিকে, শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে ২০ জন শিক্ষক প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছেন। চলতি মাসের মধ্যেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বাকি কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

‎প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান জানান, ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রীরা ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং অক্টোবরে ক্লাস শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে গ্রাফিক ডিজাইন ও আর্কিটেকচার টেকনোলজিতে ৫০ জন করে মোট ১০০ ছাত্রী ভর্তি করা হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষে আরও দুটি নতুন টেকনোলজি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও ১০০ বাড়বে। ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি সেমিস্টারে বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।

‎অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এখান থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার পর যাতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে না পড়েন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।’ সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বিশ্বে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রাফিক ডিজাইন, স্থাপত্য, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। ফলে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান রংপুর অঞ্চলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

‎সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যতের দেশ-বিদেশের চাকরির বাজারের চাহিদা মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে এই মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নতুন মাত্রা যোগ করবে। সরকার কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং নারীদের শিক্ষায় অগ্রাধিকার দিয়ে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, এটি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘রংপুর বিভাগের মানুষের জন্য এটি অনেক বড় পাওয়া। কারণ এই অঞ্চলে এটিই প্রথম সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এখান থেকে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ নারী জনশক্তি বেরিয়ে এলে দেশের শিল্প, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান খাতে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।’

‎সচেতন মহল মনে করছে, রংপুর সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট চালুর মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার নতুন দুয়ার খুলছে। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ নারী জনশক্তি গড়ে ওঠার ফলে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। চার বছর মেয়াদি এই আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে শুধু রংপুর নয়, আশপাশের জেলার নারী শিক্ষার্থীরাও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ পাবেন। ফলে দীর্ঘদিনের একটি শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে নারী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...