সত্যের পক্ষে কলম: সাংবাদিকের বন্ধু সত্য, শত্রুর তালিকা দীর্ঘ

Date:

spot_img

নাজমুল ইসলাম হৃদয়

সাংবাদিকতা নিছক একটি পেশা নয়; এটি সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা এবং মানুষের অধিকার ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন সাংবাদিকের কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা কিংবা ক্ষমতাবানদের প্রভাবের চেয়ে সংবাদে সত্যতা ও জনস্বার্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

সাংবাদিকতার ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ধারণা প্রচলিত—“সৎ সাংবাদিকের কোনো বন্ধু থাকতে নেই।” কথাটির অর্থ এই নয় যে একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত বন্ধু থাকতে পারবেন না। বরং এর মূল বক্তব্য হলো, সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেন সত্য ও ন্যায়কে প্রভাবিত করতে না পারে।

একজন সাংবাদিকের সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, আইনজীবী, সমাজকর্মী কিংবা সাধারণ মানুষের সুসম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার বা কাউকে ছাড় দেওয়ার কারণ হতে পারে না। কারণ সাংবাদিকের দায়িত্ব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি নয়—সত্য, জনগণ ও জনস্বার্থের প্রতি।

বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভালো কাজের সংবাদ প্রকাশ করলে অনেকেই সাংবাদিককে প্রশংসা করেন। ছবি তোলেন, শুভেচ্ছা জানান, পাশে থাকার আশ্বাস দেন। কিন্তু একই সাংবাদিক যখন সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি কিংবা জনদুর্ভোগের বিষয় তুলে ধরেন, তখন পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। প্রশংসার জায়গায় আসে সমালোচনা, বন্ধুত্বের জায়গায় দূরত্ব, আর কখনো কখনো শুরু হয় সাংবাদিককে চাপে রাখার চেষ্টা।

এ কারণেই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—নিজের পরিচিত কিংবা প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে সত্য সংবাদ প্রকাশ করার সাহস।

একজন সাংবাদিক যদি বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য সত্য গোপন করেন, কোনো অনিয়মের সংবাদ চেপে যান কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তির ভুলকে আড়াল করেন, তাহলে তিনি শুধু একটি সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন না; তিনি জনগণের জানার অধিকারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেন। সাংবাদিকতা তখন জনস্বার্থের জায়গা থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হলেই যে সাংবাদিকের প্রতিবেদন সঠিক—এমনটিও নয়। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিককে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করতে হবে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিতে হবে, নথিপত্র ও প্রমাণ পর্যালোচনা করতে হবে এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা মানে শুধু কঠিন কথা বলা নয়; বরং যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ করা।

দুর্নীতি দেখলে প্রশ্ন করতে হবে, অনিয়মের তথ্য পেলে অনুসন্ধান করতে হবে, জনদুর্ভোগের বিষয় সামনে আনতে হবে। ক্ষমতাবান ব্যক্তি হলে প্রশ্ন আরও দায়িত্বশীলভাবে করতে হবে। তবে প্রশ্নের উদ্দেশ্য হতে হবে সত্য উদঘাটন ও জনস্বার্থ রক্ষা—কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা নয়।

সাংবাদিকতার পথে তাই প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনা, বন্ধুত্বের পাশাপাশি বিরোধিতা এবং কখনো কখনো হুমকি বা সামাজিক চাপও আসতে পারে। সংবাদ প্রকাশের পর কেউ দূরে সরে গেলে একজন সাংবাদিকের কাজ থেমে যেতে পারে না। কারণ সাংবাদিকের কলম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মন রক্ষা করার জন্য নয়।

তবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। মিথ্যা, গুজব, অনুমান বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্যকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নয়। একইভাবে ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদে রূপ দেওয়া, যাচাই ছাড়া অভিযোগ প্রকাশ করা কিংবা কারও সম্মানহানি করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একজন আদর্শ সাংবাদিককে তাই একই সঙ্গে সাহসী, নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল হতে হয়। তিনি যেমন ক্ষমতাবানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরবেন, তেমনি নিজের পরিচিত বা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করবেন।

সাংবাদিকতার পথ কখনোই সবসময় মসৃণ নয়। সত্য প্রকাশের কারণে বন্ধুত্ব নষ্ট হতে পারে, সম্পর্কের অবনতি হতে পারে, সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু একজন সাংবাদিক যদি পেশাগত নীতি ও সত্যের প্রশ্নে আপস না করেন, তাহলে সময়ের সঙ্গে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে পাঠকের আস্থা।

শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তার কতজন বন্ধু আছে, কতজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি তাকে পছন্দ করেন কিংবা কতজন তার সঙ্গে ছবি তুলেছেন—তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তার পরিচয় নির্ধারিত হয় তিনি কতটা সত্যনিষ্ঠ, কতটা নিরপেক্ষ এবং মানুষের কথা বলার ক্ষেত্রে কতটা সাহসী।

তাই বলা যায়, সাংবাদিকের ব্যক্তিগত বন্ধু থাকতে পারে; কিন্তু সংবাদের টেবিলে তার কোনো পক্ষ থাকা উচিত নয়। সেখানে একমাত্র পক্ষ হলো সত্য ও জনস্বার্থ। সত্য প্রকাশের কারণে যদি শত্রুর তালিকা দীর্ঘও হয়, তবুও দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কলম থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—সত্যকে সত্য বলা এবং অন্যায়কে অন্যায় বলা।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...