
বিশেষ প্রতিবেদক
৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়। এটি ছিল দীর্ঘ দমন, বৈষম্য, বঞ্চনা, ভোটাধিকারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের বিজয়দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। শহীদের রক্ত, আহতদের ত্যাগ এবং লাখো মানুষের সাহস সেই পরিবর্তনের ভিত্তি নির্মাণ করে।
জুলাইয়ের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গুলি, গ্রেপ্তার এবং দমন বাড়তে থাকলে আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যায়। শিক্ষার্থীদের দাবি সাধারণ মানুষের দাবিতে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, কর্মজীবী মানুষ, পেশাজীবী, অভিভাবক এবং সাধারণ নাগরিক এক কাতারে দাঁড়ান। একপর্যায়ে আন্দোলন আর শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হত্যার বিচার, রাষ্ট্রীয় দমন বন্ধ, সরকারের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি সামনে আসে।
৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এক দফা দাবি ঘোষণার পর আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করে। ৫ আগস্ট কারফিউ, বাধা ও আতঙ্ক উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। রাজধানীর রাজপথ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সরকারের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত ভেঙে পড়ে। দুপুরের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে গণভবন ও রাজপথে মানুষের ঢল নামে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি ক্ষমতার কেন্দ্র জনতার প্রতিরোধের মুখে পতিত হয়।
তবে ৫ আগস্টের বিজয় শুধু একজন শাসকের বিদায় ছিল না। এটি ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা। শহীদ পরিবার, আহত আন্দোলনকারী এবং সাধারণ মানুষ এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে ভোটের অধিকার থাকবে, আইনের শাসন কার্যকর হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকবে এবং নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা পাবে। তারা চেয়েছিলেন, পুলিশ, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং নির্বাচনব্যবস্থা জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
দুই বছর পর এসে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সেই আকাঙ্ক্ষা কতটা পূর্ণ হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার কতদূর এগিয়েছে, আহতরা কতটা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পেয়েছেন, শহীদ পরিবারগুলো রাষ্ট্রের কাছ থেকে কতটা সম্মান ও সহায়তা পেয়েছে, এসব প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অগ্রগতি থাকলেও জনগণের প্রত্যাশা ছিল আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান বিচার।
বর্তমান সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। শহীদ পরিবার ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদদের স্মৃতি রক্ষা এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগও ইতিবাচক। সরকার বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করেছে। নির্বাচন, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন কাঠামো নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে।
এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, সরকার জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী স্বীকৃতি দিতে চায়। তবে ঘোষণা, আইন এবং কমিশন গঠনই শেষ কথা নয়। শহীদ পরিবার ও আহতরা বাস্তবে কতটা সহায়তা পাচ্ছেন, বিচার কত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে এগোচ্ছে এবং সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষ কতটা অনুভব করছেন, শেষ পর্যন্ত তার ভিত্তিতেই সরকারের সাফল্য বিচার করা হবে।
বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ক্ষমতার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। দলীয় প্রভাব, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, প্রশাসনে হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ যদি অব্যাহত থাকে, তবে শুধু সরকারের নাম বদলাবে, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে না। জুলাইয়ের শহীদেরা এমন বাংলাদেশের জন্য জীবন দেননি, যেখানে পুরোনো অন্যায়ের জায়গায় নতুন অন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
৫ আগস্টকে তাই শুধু বিজয় উদ্যাপনের দিন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সরকারের জন্য জবাবদিহিরও দিন। জনগণের সামনে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, জুলাই হত্যার বিচার কতদূর, সংস্কারের কোন কাজ সম্পন্ন হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং প্রতিশ্রুত পরিবর্তন কবে দৃশ্যমান হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার কোনো সরকারের রাজনৈতিক সম্পদ নয়। এটি জনগণের আমানত।
অভ্যুত্থানের পর ছাত্র নেতৃত্বের একটি অংশ জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপি গঠন করে সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। এটি অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে রাজনৈতিক দল গঠনের এই যাত্রা নতুন প্রজন্মের রাষ্ট্রচিন্তা ও ক্ষমতার কাঠামোয় অংশ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।
তবে জুলাই কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক অর্জন নয়। এনসিপিসহ অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা সব রাজনৈতিক শক্তির সাফল্য নির্ভর করবে তারা কতটা গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ, সহনশীল এবং জনস্বার্থনির্ভর রাজনীতি করতে পারে তার ওপর। জুলাইয়ের নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া নয়, বরং ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা এবং জবাবদিহির আদর্শ ধারণ করাই হবে তাদের বড় পরীক্ষা।
অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন এলেও বিভক্তি পুরোপুরি কমেনি। পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতি, প্রতিহিংসা, দখলদারিত্ব এবং প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা নতুনভাবে সামনে এসেছে। যে আন্দোলন বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে হয়েছিল, তার পরবর্তী বাংলাদেশেও যদি একই আচরণ ফিরে আসে, তবে সেটি শহীদের রক্তের প্রতি অবমাননা হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বড় শিক্ষা হলো, জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো ক্ষমতাই স্থায়ী নয়। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের কথা শুনতে ব্যর্থ হয়, তখন রাজপথই শেষ আদালতে পরিণত হয়। তবে রাজপথের বিজয়কে রাষ্ট্রের স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ দেওয়া আরও কঠিন কাজ। একটি সরকারের পতন ইতিহাসের বড় ঘটনা, কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ তার চেয়েও বড় দায়িত্ব।





