বিশ্বকাপে প্রেম

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

প্রিয় পাঠক,
ফুটবলকে আমরা প্রায়ই যুদ্ধ বলি। মাঠকে বলি যুদ্ধক্ষেত্র। খেলোয়াড়দের বলি যোদ্ধা। অথচ শেষ বাঁশি বাজলেই এই যুদ্ধের ভাষা বদলে যায়। তখন প্রতিপক্ষের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত, কাঁধে রাখা একটি মাথা কিংবা নীরব একটি আলিঙ্গন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ফুটবলের শেষ কথা প্রতিশোধ নয়। শেষ কথা প্রেম।

আটলান্টার মাঠে সেই চিরন্তন দৃশ্যই আবার দেখা গেল।

ইংল্যান্ডকে ২–১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। শেষ কয়েক মিনিটে বদলে গেছে পুরো ম্যাচের গল্প। ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙেছে। আর্জেন্টিনার সামনে খুলেছে আরেকটি ফাইনালের দরজা। চারদিকে তখন নীল-সাদা উল্লাস। সতীর্থরা ছুটছেন একে অন্যের দিকে। গ্যালারি কাঁপছে। কিন্তু সেই উল্লাসের মাঝখানে লিওনেল মেসি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য একা হয়ে গেলেন।

তারপর এগিয়ে এলেন হ্যারি কেন।

তিনি মেসিকে জড়িয়ে ধরলেন। মেসি মাথা রাখলেন তাঁর বুকে। কেনের একটি হাত মেসির মাথায়। আরেকটি হাত তাঁকে আগলে রেখেছে। কে বিজয়ী, কে পরাজিত, ছবিটির দিকে তাকিয়ে তখন আর বোঝার উপায় নেই। মনে হয়, একজন মানুষ আরেকজন মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি বুঝতে পেরেছেন।

মেসির কান্না শুধু একটি ম্যাচ জেতার কান্না ছিল না। হয়তো সেটি ছিল দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আবারও শেষ দরজায় পৌঁছানোর আবেগ। হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর জন্য আর খুব বেশি রাত অপেক্ষা করে নেই। যে মানুষটি জীবনের এত বছর একটি বলের পেছনে ছুটেছেন, তাঁর চোখে সেদিন আনন্দের সঙ্গে বিদায়ের ছায়াও মিশে ছিল।

আর হ্যারি কেন?

মাত্র কিছুক্ষণ আগেই তাঁর নিজের স্বপ্ন ভেঙেছে। ইংল্যান্ড এত কাছে গিয়েও ফাইনালে উঠতে পারেনি। তবু নিজের কান্না সামলে তিনি এগিয়ে এসেছেন প্রতিপক্ষের অধিনায়কের দিকে। যে মানুষটি তাঁকে পরাজিত করেছেন, তাকেই বুকের কাছে টেনে নিয়েছেন।

এমন আলিঙ্গন শেখানো যায় না। এটি আসে ভেতর থেকে। যে নিজে স্বপ্ন ভাঙার শব্দ শুনেছে, সে অন্যের হৃদয়ের শব্দও শুনতে পারে।

বিশ্বকাপের ইতিহাস এমন দৃশ্যে ভরা।

১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের পেলে আর ইংল্যান্ডের ববি মুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। ব্রাজিল জিতেছিল ১–০ গোলে। কিন্তু ম্যাচের ফলের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়ে আছে খেলা শেষে তাঁদের আলিঙ্গনের ছবিটি। দুজন জার্সি বদল করেছিলেন। ঘাম আর কাদায় ভেজা শরীরে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। একজন ছিলেন ফুটবলের রাজা। অন্যজন ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়ী অধিনায়ক। সেই ছবিতে অহংকার ছিল না। ছিল একজন মহৎ খেলোয়াড়ের প্রতি আরেকজন মহৎ খেলোয়াড়ের নিঃশব্দ স্বীকৃতি।

১৯৯০ সালে ইতালির মাঠে পল গ্যাসকোয়েন কেঁদেছিলেন শিশুর মতো। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে হলুদ কার্ড দেখেই তিনি বুঝেছিলেন, ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলেও তিনি খেলতে পারবেন না। তাঁর চোখ বেয়ে নেমেছিল জল। মাঠের যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। কিন্তু সেই কান্না ছড়িয়ে পড়েছিল গ্যালারি থেকে ঘরে ঘরে। ইংল্যান্ডের কোচিং বেঞ্চকে সতর্ক করে গ্যারি লিনেকারের সেই বিখ্যাত ইশারা যেন বলেছিল, ছেলেটির দিকে খেয়াল রাখুন। বিশ্বকাপ সেদিন একজন খেলোয়াড়ের দুর্বলতাকে লুকায়নি। বরং দেখিয়েছিল, একজন পুরুষও কাঁদতে পারেন। একটি হলুদ কার্ডও কখনো মানুষের বহু বছরের স্বপ্নে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।

২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাঠে কেঁদেছিলেন কলম্বিয়ার তরুণ জেমস রদ্রিগেজ। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে তাঁর বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়। ছয় গোল করে বিশ্বকে মুগ্ধ করা সেই তরুণের চোখে তখন অসহায় অশ্রু। বিজয়ী ব্রাজিলের ডেভিড লুইজ এগিয়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। শুধু সান্ত্বনা দেননি, দর্শকদের সামনে জেমসকে তুলে ধরেছিলেন। যেন বলেছিলেন, আমরা জিতেছি ঠিকই, কিন্তু এই ছেলেটিও সম্মানের দাবিদার। পরাজিত একজন খেলোয়াড়কে বিজয়ী প্রতিপক্ষের এমনভাবে সম্মান জানানোর ছবিটি বিশ্বকাপের মানবিক ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে।

২০১৮ সালে মস্কোর বৃষ্টিভেজা রাতে লুকা মদ্রিচ দাঁড়িয়েছিলেন নিঃসঙ্গ এক রাজপুত্রের মতো। ক্রোয়েশিয়াকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের কাছে হারতে হয়েছে। সেরা খেলোয়াড়ের সোনালি বলটি তাঁর হাতে উঠেছিল, কিন্তু মুখে ছিল না বিজয়ের হাসি। বৃষ্টির ভেতর দিয়ে পুরস্কার নিতে যাওয়া মদ্রিচের চোখে ছিল এমন এক শূন্যতা, যা শুধু পরাজিত স্বপ্নবাজরাই বোঝে। বিশ্ব তাঁকে সেরা বলেছিল, অথচ তিনি জানতেন, যে কাপটির জন্য এত দূর এসেছিলেন, সেটি অন্য কারও হাতে। সেই রাতও শিখিয়েছিল, সম্মান কখনো কখনো ট্রফির চেয়েও বড়।

চার বছর পর কাতারের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলেন মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। একজন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্বকাপ খুঁজছিলেন। অন্যজন অল্প বয়সেই দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এমবাপ্পে ফাইনালে তিনটি গোল করেও হেরে গেলেন। মেসি জিতলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি। সেই রাতে একই মাঠে আনন্দের সবচেয়ে উঁচু শিখর আর বেদনার সবচেয়ে গভীর খাদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। একজন ট্রফি হাতে অমর হলেন। অন্যজন গোল্ডেন বুট হাতে নিঃসঙ্গ হয়ে বসে রইলেন। তবু প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরেও তাঁদের মধ্যে ছিল পরস্পরের প্রতিভার স্বীকৃতি। বিশ্বকাপ আবারও দেখাল, একই খেলায় একজনের পূর্ণতা কখনো অন্যজনের অসমাপ্তি হয়ে আসে।

এই প্রেম শুধু বিখ্যাত খেলোয়াড়দের মধ্যে নয়। বিশ্বকাপ শুরু হলেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজের দেশের বাইরেও আরেকটি দেশকে ভালোবেসে ফেলে। বাংলাদেশের কেউ আর্জেন্টিনার পতাকা তোলে। ভারতের কেউ ব্রাজিলের জার্সি পরে। আফ্রিকার কোনো শিশু পর্তুগালের এক খেলোয়াড়ের জন্য কাঁদে। ইউরোপের কোনো বৃদ্ধ লাতিন আমেরিকার ছোট একটি দলের জয়ে আনন্দে চিৎকার করে ওঠেন। জন্মের দেশ এক, ভালোবাসার দল আরেক। ফুটবল এভাবেই মানচিত্রের সীমারেখার ওপর দিয়ে মানুষের হৃদয়কে এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে যায়।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “সম্প্রসারণই জীবন, সংকীর্ণতাই মৃত্যু। প্রেমই জীবন, দ্বেষই মৃত্যু।”

বিশ্বকাপ যেন চার বছর পরপর

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...

বরিশালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউরো স্টার বাস খাদে, শিশুসহ আহত ৫

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি বরিশালের গৌরনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে...

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হলেন চুয়াডাঙ্গার কৃতি সন্তান ডা.মেহেবুব

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত...