যখন একটি চিঠি বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপ

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

প্রিয় পাঠক,

১৯৮২ সালের গ্রীষ্ম। স্পেনে চলছে বিশ্বকাপ।

ইতালির মানুষ তখন নিজেদের দল নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নয়। দলটি কোনো মতে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে। তিনটি গ্রুপ ম্যাচের একটিও জিততে পারেনি তারা। সংবাদপত্রে সমালোচনা। টেলিভিশনে বিতর্ক। সমর্থকদের হতাশা।

সবচেয়ে বেশি সমালোচিত মানুষটির নাম পাওলো রোসি।

মাত্র কয়েক বছর আগেও তিনি ছিলেন ইতালির ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল তারকা। কিন্তু ম্যাচ পাতানোর কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে দুই বছর নিষিদ্ধ ছিলেন। বিশ্বকাপের ঠিক আগে তিনি মাঠে ফিরেছেন। অনেকেরই বিশ্বাস ছিল না যে তিনি এখনও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে পারবেন।

স্পেন বিশ্বকাপে সেই সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।

প্রথম তিন ম্যাচে রোসি গোল করতে পারেননি। মাঠে তাকে ধীর মনে হচ্ছিল। আত্মবিশ্বাসহীন মনে হচ্ছিল। ইতালির সংবাদপত্রগুলো তাকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করে। কেউ কেউ লিখেছিল, বিশ্বকাপে তাকে নেওয়াই ভুল হয়েছে।

একজন স্ট্রাইকারের জন্য এর চেয়ে কঠিন সময় আর কী হতে পারে?

ঠিক সেই সময়ই রোসির কাছে পৌঁছায় বাড়ি থেকে পাঠানো একটি চিঠি।

আজকের দিনে ব্যাপারটা খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু তখন মোবাইল ফোন ছিল না। ভিডিও কল ছিল না। পরিবারের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলার সুযোগও ছিল না। দূর দেশে খেলতে থাকা একজন ফুটবলারের কাছে একটি চিঠি মানে ছিল বাড়ির একটা অংশ হাতে পাওয়া।

চিঠিতে কোনো কৌশল ছিল না। কোনো ফুটবল বিশ্লেষণ ছিল না। ছিল শুধু পরিবারের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর অপেক্ষার কথা।

অনেক বছর পরে রোসি স্মরণ করেছিলেন, কঠিন সময়ে পরিবারের সমর্থন তাকে নতুন শক্তি দিয়েছিল।

এরপর শুরু হয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য রূপকথা।

দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালির সামনে পড়ে ব্রাজিল। সেই ব্রাজিল দলকে অনেকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলে মনে করেন। জিকো, সক্রেটিস, ফালকাও, জুনিয়র—তারকায় ভরা এক দল।

বিশ্বকাপের আগে কেউ যদি বলত ইতালি জিতবে, হয়তো তাকে পাগল ভাবা হতো।

কিন্তু সেই ম্যাচে যা ঘটল, তা আজও বিশ্বকাপের কিংবদন্তি।

পাওলো রোসি একাই করলেন হ্যাটট্রিক।

ইতালি জিতল ৩-২ গোলে।

এক ম্যাচেই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে তিনি হয়ে গেলেন জাতীয় নায়ক।

কিন্তু রূপকথা তখনও শেষ হয়নি।

সেমিফাইনালে পোল্যান্ডের বিপক্ষেও জোড়া গোল করলেন রোসি। ইতালি পৌঁছে গেল ফাইনালে।

ফাইনালে প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি।

মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বের্নাব্যু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালেও গোল করলেন রোসি। ইতালি জিতল ৩-১ ব্যবধানে। ১৯৩৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি উঠল ইতালির হাতে।

আর যে মানুষটিকে কয়েক সপ্তাহ আগে দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছিল, তিনিই হলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

জিতলেন গোল্ডেন বুট।

জিতলেন গোল্ডেন বল।

জিতলেন বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত বস্তু আছে। পেলের জার্সি আছে। ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ বল আছে। জিদানের হেডের ছবি আছে। মেসির বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্ত আছে।

কিন্তু পাওলো রোসির সেই চিঠিটি নেই।

কেউ জানে না সেটি এখন কোথায়।

হয়তো কোনো পুরোনো ড্রয়ারে হারিয়ে গেছে। হয়তো সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে গেছে।

তবু বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার একটি অদৃশ্য উপস্থিতি রয়ে গেছে।

কারণ ফুটবল শুধু কৌশল, গতি আর প্রতিভার খেলা নয়। কখনো কখনো এটি বিশ্বাসেরও খেলা।

আর ১৯৮২ সালের সেই গ্রীষ্মে, স্পেনের বিশ্বকাপে, একটি সাধারণ চিঠি হয়তো একজন হতাশ ফুটবলারের মনে আবার বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিল।

আর সেই বিশ্বাসই তাকে পৌঁছে দিয়েছিল ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে।

[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...