
আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ), রংপুর
তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ, যুক্তিনির্ভর চিন্তাচর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং তথ্যভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বৃহৎ পরিসরের আন্তঃউপজেলা বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০২৬। উন্নত বাংলাদেশ গঠনে তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ) প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মঙ্গলবার (১৬ জুন) আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় উপজেলার ৯৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা, প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ এবং যুক্তির শক্তিশালী উপস্থাপনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। আয়োজকদের মতে, বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা এবং দায়িত্বশীল নাগরিকত্ববোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে বিতর্কচর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এ ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যেখানে উপজেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে নিজেদের মেধা, যুক্তি ও বক্তব্য প্রদানের দক্ষতা প্রদর্শন করেন।
প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্বে অংশগ্রহণকারী ৯৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে চারটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে। স্কুল বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে শঠিবাড়ী শিশু নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয় এবং রানার্সআপ হয় লিজেন্ড পাবলিক স্কুল। এ বিভাগে অসাধারণ যুক্তি উপস্থাপন ও সাবলীল বক্তব্যের জন্য শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হন শঠিবাড়ী শিশু নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদিবা মেহজাবিন মেধা।অন্যদিকে কলেজ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে ছড়ান কলেজ এবং রানার্সআপ হয় বালারহাট কলেজ। কলেজ বিভাগের শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হন ছড়ান কলেজের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান, যিনি তার তথ্যসমৃদ্ধ বক্তব্য, বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনা এবং যুক্তির দৃঢ়তায় বিচারকদের মুগ্ধ করেন।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার, সনদপত্র এবং সম্মাননা তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পারভেজ আলম। এছাড়াও উপজেলা প্রকল্প পরিচালক মনিরুজ্জামান, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “একটি উন্নত, আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বিতর্ক শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি যুক্তিবাদী ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের মধ্যে সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “৯৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পেছনে ফেলে যারা আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে, তাদের সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় বিষয় হলো শেখা, আত্মবিশ্বাস অর্জন এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ। এ ধরনের আয়োজন তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।” অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য (ডিসইনফরমেশন) প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলেও এর অপব্যবহার সমাজে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার করা ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই গুজব প্রতিরোধে তরুণদের সচেতন, দায়িত্বশীল এবং তথ্য-সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। বক্তারা আরও বলেন, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রচারে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বিতর্কচর্চা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই দক্ষতা ও মানসিকতা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
আয়োজকরা জানান, তরুণদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি, যোগাযোগ দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। তারা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতেও নিয়মিত আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং একটি সচেতন, দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভর প্রজন্ম গড়ে উঠবে। অনুষ্ঠানটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন, IRDIES Bangladesh, কম্পাসন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে দিনব্যাপী এ আয়োজন এক প্রাণবন্ত শিক্ষামূলক উৎসবে পরিণত হয়।





