
আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
আপনি যখন সকালের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এই লেখাটিতে চোখ বোলাচ্ছেন, ততক্ষণে হয়তো শেষ বাঁশি বেজে গেছে। রাতের শেষ ম্যাচটার ফলাফল এখন আপনার জানা। হয়তো একটা চোখধাঁধানো গোলের আনন্দ নিয়ে ভোর হয়েছে আপনার, কিংবা একটা পেনাল্টি মিসের আফসোস বুকে নিয়ে ঘুমোতে গেছেন। তবে এই লেখাটি কোনো নির্দিষ্ট দলের জয়-পরাজয়ের খতিয়ান নয়। এটি আসলে কোনো দূরদেশের মাঠের গল্পও নয়, এটি আমাদের নিজেদের গল্প।

বিশ্বকাপের মূল মানচিত্রে, ফিফার অফিশিয়াল ফিক্সচারে লাল-সবুজ জার্সির কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ যখনই ফুটবল মহোৎসবের বাঁশি বাজে, এ দেশের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যায়।
বিশ্বকাপ খেলতে না পারা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ হয়তো এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম। মাঠে আমাদের কোনো প্রতিনিধি নেই, কিন্তু আবেগে আমরা যেন প্রতিবারই অংশগ্রহণকারী। ছাদের কার্নিশে কার্নিশে হলুদ-সবুজ পতাকার পাশে তখন বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে যায় আকাশি-সাদা ব্যানার। বাড়ির মালিক হয়তো কট্টর ব্রাজিল সমর্থক, আর ভাড়াটিয়া আর্জেন্টিনার। ব্যাস, এক চিলতে দেয়ালকে কেন্দ্র করে রাতারাতি তৈরি হয়ে যায় রিও ডি জেনিরো আর বুয়েনস আইরেসের সীমানা।
পাড়ার টং দোকানে একটা কাঠের বেঞ্চ, একটা রঙিন টেলিভিশন আর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা নিয়েই বসে যান পেপ গার্দিওলা কিংবা স্কালোনির চেয়েও বড় বড় সব নিশাচর ফুটবল বিশ্লেষক। খেলা শেষ হলেও তাদের আলোচনা শেষ হয় না। কে ভুল করল, কে সুযোগ নষ্ট করল, পরের ম্যাচে কাকে নামানো উচিত—সব প্রশ্নের উত্তর যেন তাদের কাছেই আছে।
এ দেশের সিংহভাগ মানুষ পেলেকে লাইভ খেলতে দেখেনি, কিন্তু পেলের গল্প শুনে বড় হয়েছে। কেউ এখনও চুলে পাক ধরা বয়সে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে বর্ণনা করেন, কীভাবে ১৯৮৬ সালে মারাদোনা একের পর এক ডিফেন্ডার কাটিয়ে গোল করেছিলেন। যেন সেই ম্যাচটি তিনি গতকালই মেক্সিকোর স্টেডিয়ামে বসে দেখে এসেছেন।
সেই রূপকথার ব্যাটনটা জিনেদিন জিদান, রোনালদো, রোমারিও হয়ে আজকের লিওনেল মেসি কিংবা নেইমারের হাতে এসে পৌঁছেছে। বাবার হাত ধরে যে ছেলেটি প্রথম কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখে রাত জেগেছিল, সে আজ নিজেই বাবা হয়ে ছেলেকে বোঝাচ্ছে অফসাইডের নিয়ম। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এভাবেই আমরা ফুটবলের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে চলি।
মাঝেমধ্যে এই ফুটবলকে কেন্দ্র করে অদ্ভুত সব কাণ্ডও ঘটে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে তর্ক করতে করতে হরিহর আত্মা দুই বন্ধুর কথা বন্ধ হয়ে যায়। জামাই-শ্বশুরের মধ্যে তৈরি হয় অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। পাড়ার মোড়ে ছোট্ট একটা বাজি নিয়ে সপ্তাহজুড়ে খুনসুটি চলে। কখনও কখনও সেই উন্মাদনা সংবাদপত্রের শিরোনামও হয়। এগুলো হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু এগুলোই বলে দেয়—ফুটবল এখানে স্রেফ বিনোদন নয়, এক গভীর আবেগের নাম।
২২ জন মানুষ হাজার হাজার মাইল দূরে একটা চামড়ার বলের পেছনে ছুটছেন, আর সেই উত্তেজনায় কাঁপছে বুড়িগঙ্গা থেকে রূপসার তীর। কোনো গ্রুপ পর্বে আমাদের নাম নেই, কোনো ট্রফির গায়ে খোদাই হবে না বাংলাদেশের নাম। তবু প্রতিটি গোলের উল্লাসে বাংলাদেশ হাসে, প্রতিটি পরাজয়ের দীর্ঘশ্বাসে এই জনপদের আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। চার বছর ধরে মানুষ অপেক্ষা করে এই একটি মাসের জন্য। আজ রাতে যে দলই জিতুক বা হারুক, আগামীকাল আবার পাড়ার মোড়ে নতুন করে তর্ক শুরু হবে, আবার হিসেব কষা হবে গোল ডিফারেন্সের।
কারণ, ফুটবল এই বাংলাদেশে কেবলই একটা খেলা নয়। এটি স্মৃতি। এটি শৈশবের নস্টালজিয়া। এটি বাবা থেকে সন্তানের হাতে তুলে দেওয়া এক অদৃশ্য উত্তরাধিকার। এটি প্রতি চার বছর পর পর ফিরে আসা এক সামাজিক উৎসব।
আর সেই উৎসবে বাংলাদেশের মানুষ কখনোই গ্যালারির সাধারণ দর্শক নয়। তারা মাঠের সমান তীব্রতায় খেলা একেকজন খাঁটি অংশগ্রহণকারী।
তাই তো, যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, সেই বিশ্বকাপ জুড়েই আসলে বাংলাদেশ থাকে।
প্রতিটি পতাকার রঙে।
প্রতিটি গোলের উল্লাসে।
প্রতিটি পরাজয়ের দীর্ঘশ্বাসে।
প্রতিটি রাতজাগা সমর্থকের চোখের কোণে।





