
রাজিবুল ইসলাম রাজিব, খুলনা প্রতিনিধি
দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ ও লোকসানে থাকা খুলনার ঐতিহ্যবাহী দুই রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান—খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস ও হার্ডবোর্ড মিলের জায়গায় আধুনিক লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে চীনের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন-এর সঙ্গে বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উৎপাদনহীন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন এবং নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস ও হার্ডবোর্ড মিলের স্থানে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের ইতিহাস
খুলনার খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে প্রায় ১০৩ একর জমির ওপর ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান স্যান্ডওয়েল কোম্পানির কারিগরি সহায়তায় নির্মিত এ কারখানায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৭৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
মিলটিতে নিউজপ্রিন্টের পাশাপাশি বুকপ্রিন্ট, র্যাপার, ব্লু ম্যাচ পেপার ও মেকানিক্যাল প্রিন্ট উৎপাদন করা হতো। বছরে ৪৮ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তবে ধারাবাহিক লোকসানের অজুহাতে ২০০২ সালে মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও নিরাপত্তা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করতে হয়েছে সরকারকে।
প্রতিশ্রুতি ছিল, বাস্তবায়ন হয়নি
মিলটি পুনরায় চালুর দাবিতে শ্রমিক ও স্থানীয় জনগণের আন্দোলন বহুবার আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে মিল চালুর কথা বললেও বাস্তবে তা আর সম্ভব হয়নি।
এরই মধ্যে মিলটির অধিকাংশ যন্ত্রপাতি নিলামে বিক্রি হয়ে গেছে। অতীতে এখানে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থায়নের অভাবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া মিলের কিছু জমি বিসিক ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
হার্ডবোর্ড মিলও ইতিহাস
নিউজপ্রিন্ট মিল ও দৌলতপুর জুট মিলের মাঝামাঝি এলাকায় ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় খুলনা হার্ডবোর্ড মিল। প্রায় ১০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এ কারখানায় সুন্দরবনের সুন্দরী কাঠ ব্যবহার করে হার্ডবোর্ড উৎপাদন করা হতো।
সিলিং, পার্টিশন, স্টল, প্যাভিলিয়ন ও হালকা আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হার্ডবোর্ড একসময় ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু কাঁচামাল সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং বাজার চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে এবং ২০১৩ সালে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন শিল্পায়নের কৌশল
শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরোনো ও অলাভজনক শিল্প পুনরায় চালুর পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্পদকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রযুক্তি খাতে লিথিয়াম ব্যাটারির ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সামনে রেখে এ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
বাণিজ্য, বস্ত্র, পাট ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর গণমাধ্যমকে জানান, বর্তমানে বন্ধ হয়ে থাকা মিলগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের বাজার ও ব্যবহার আগের মতো নেই। তাই নতুন শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার বিকল্প শিল্পায়নের পথ খুঁজছে।
আশার আলো নাকি নতুন প্রতিশ্রুতি?
খুলনার শিল্পাঞ্চল খালিশপুর একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। একের পর এক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাটি ‘মৃত শিল্পনগরী’ হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানীয়দের আশা, লিথিয়াম ব্যাটারি কারখানার মতো আধুনিক শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দীর্ঘদিনের স্থবির শিল্পাঞ্চলে আবারও প্রাণ ফিরে আসবে।





