
ছাদেক হোছাইন, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন এক নীরব মহামারি গ্রাস করেছে। যে শান্ত-সবুজ গ্রামগুলো চিরকাল শান্তিনিষ্ঠা আর কৃষির জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে এখন মরণ কামড় বসিয়েছে অনলাইন জুয়া বা ডিজিটাল বেটিং। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণ থেকে শুরু করে দিনমজুর, এমনকি মধ্যবয়সী কৃষকেরাও এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। দ্রুত বড়লোক হওয়ার চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার, বিঘ্নিত হচ্ছে গ্রামীণ সামাজিক স্থিতিশীলতা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চকরিয়া পৌরসভা ছাড়াও ডুলাহাজারা, চিরিঙ্গা, বরইতলী, হারবাং, খুটাখালী, এবং উপকূলীয় অঞ্চল বদরখালী ও কোনাখালীর মতো প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও এই জুয়ার জাল ছড়িয়ে পড়েছে। চায়ের দোকান, বাজারের কোণ কিংবা পানের দোকানে বসে দলবেঁধে তরুণদের মোবাইলে মগ্ন থাকার দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। জনপ্রিয় ফুটবল বা ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে বিদেশি বিভিন্ন বেটিং অ্যাপ ও সাইটে বাজি ধরছে তারা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয় কিছু অসাধু বিকাশ, রকেট বা নগদ এজেন্ট এই জুয়ার টাকা লেনদেনের ‘ক্যাশ ইন’ ও ‘ক্যাশ আউট’ এর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে।
চকরিয়ার অর্থনীতি মূলত কৃষি, লবণ চাষ ও চিংড়ি ঘেরের ওপর নির্ভরশীল। কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত এই টাকা জুয়ার সাইটে ঢালছেন স্থানীয় মেহনতি মানুষ। প্রথম দিকে সামান্য কিছু টাকা জিতিয়ে লোভের সাগরে ভাসানো হয়, আর পরবর্তীতে সেই টাকা তুলতে গিয়ে একে একে জমি বন্ধক, হালের গরু বিক্রি, এমনকি চড়া সুদে দাদন নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
টমটচালক মনির হোসেন বলেন, প্রতিদিন টমটম চালিয়ে ১৫০০ টাকা আয় করতাম, যা দিয়ে সংসার ভালোভাবেই চলতো। একদিন এক বন্ধুকে দেখি ১০ মিনিটে ১০০ টাকার বিনিময়ে ১০ হাজার টাকা জিতলো। এটা দেখে লোভে পড়ে আমিও জুয়া খেলতে শুরু করি। এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আমি পালিয়ে বেড়াই।
এছাড়াও, চকরিয়ার একাধিক গ্রামের ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, জুয়ার টাকার জন্য ঘরে ঘরে অশান্তি, স্বামী-স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদ এবং পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ঋণের বোঝা সইতে না পেরে অনেক তরুণ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
অনলাইন জুয়ার এই আগ্রাসনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে চকরিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকায় চুরি, ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসার মতো অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। উঠতি বয়সী কিশোর ও যুবকেরা জড়িয়ে পড়ছে নানা গ্যাং কালচারে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই মরণনেশা রুখতে না পারলে চকরিয়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক চরম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ও সদ্য ঘোষিত মাতামুহুরী উপজেলার বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইউসুফ বদরী বলেন, “অনলাইন জুয়া বর্তমানে সমাজের জন্য একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটি তরুণ সমাজকে বিপথগামী করার পাশাপাশি অনেক পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে স্থানীয় ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, মসজিদের ইমাম, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা-সেমিনার আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে যুবসমাজকে এ বিষয়ে সচেতন করতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধ সম্ভব।”
এছাড়াও, চকরিয়ার স্থানীয় সমাজসেবক ও শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই অদৃশ্য জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার প্রতিটি গ্রামে ব্যাপক সামাজিক প্রতিরোধ। জুয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আলোচনা করা জরুরি।
একই সাথে পুলিশ প্রশাসন ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে স্থানীয় জুয়ার ডিলার এবং অবৈধ লেনদেনে জড়িত মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন চকরিয়াবাসী।





