
খুলনা থেকে রাজিবুল ইসলাম রাজিব
পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই খুলনার গ্রামপাড়া-মহল্লাজুড়ে আবারও জেগে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী কামারপাড়া। কয়লার আগুনে গনগনে লাল লোহা, হাতুড়ির আঘাতে ছিটকে পড়া আগুনের ফুলকি আর টুংটাং শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে জেলার বিভিন্ন কামারশালা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা।
খুলনার রূপসা, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে কামারদের এখন বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় চলছে। কেউ নতুন সরঞ্জাম তৈরি করছেন, আবার কেউ পুরোনো দা-ছুরিতে শান দিচ্ছেন। ঈদের আগে অর্ডার বুঝিয়ে দিতে অনেক কর্মকারের দোকানে অতিরিক্ত শ্রমিকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
যান্ত্রিক প্রযুক্তির প্রসার ঘটলেও পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো কিংবা মাংস ও হাড় কাটার কাজে এখনও হাতে তৈরি লোহার সরঞ্জামের কদর সবচেয়ে বেশি। ফলে পছন্দমতো ও টেকসই দা-ছুরি তৈরি করতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে কামারশালাগুলোতে।
স্থানীয় কর্মকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লোহার মান ও ওজনভেদে ছোট ছুরি তৈরিতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, বঁটি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, চাপাতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং বড় জবাইয়ের ছুরি তৈরিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো দা-ছুরিতে শান দিতে খরচ পড়ছে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা।
কর্মকাররা জানান, বছরের অন্য সময়ে কাজ কম থাকলেও কোরবানির ঈদকে ঘিরে এই সময়টিই তাদের প্রধান আয়ের মৌসুম। সাধারণ সময়ে একজন কারিগর যেখানে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন, সেখানে ঈদের আগে সেই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়।
ডুমুরিয়া বাজার এলাকার কারিগর নিরাপদ কর্মকার (৪৫) বলেন,“আমার দাদা এই কাজ করতেন। তার কাছ থেকে শিখে আমার বাবা কাজ করেছেন, এখন আমি করছি। এই পেশা সহজ নয়। লোহা পিটিয়ে দা-ছুরি বানাতে অনেক সাধনা লাগে। সারা বছর আয় কম হলেও কোরবানির ঈদের সময় কাজের চাপ ও আয় দুটোই বেড়ে যায়। এই সময়ের উপার্জন দিয়েই সংসারের বড় বড় প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করি।”
পাচপোতা এলাকার আরেক কর্মকার বলেন,
“কয়লার দাম বেড়েছে, খরচও আগের চেয়ে বেশি। তারপরও দিন-রাত কাজ করছি, যাতে ঈদের আগেই সব অর্ডার বুঝিয়ে দিতে পারি। এখন দম ফেলার সময় নেই। তবে বছরের এই ব্যস্ত সময়টা আমাদের ভালোই লাগে।”
জেলার বিভিন্ন পশুর হাটে ইতোমধ্যে কোরবানির পশু কেনাবেচা শুরু হওয়ায় কামারপাড়ার ব্যস্ততাও বেড়েছে কয়েকগুণ। স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি অনেকেই অস্থায়ীভাবে হাটসংলগ্ন এলাকায় দোকান বসিয়ে সরঞ্জাম তৈরি ও শান দেওয়ার কাজ করছেন।
তীব্র গরম, কয়লার ধোঁয়া আর নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের মধ্যেও মুখে হাসি ধরে রেখেছেন কামাররা। কারণ, কোরবানির ঈদ ঘিরে এই কয়েক সপ্তাহের উপার্জনের ওপরই নির্ভর করে তাদের বছরের বড় একটি অংশের সংসার খরচ।





