রেললাইনের ধারে মায়েদের জীবন: কষ্ট, আতঙ্ক আর সন্তানের স্বপ্ন

Date:

spot_img

‎রংপুর প্রতিনিধি

‎মা ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর গভীরতা পৃথিবীর সব সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। সন্তানের জন্য নিজের সুখ, স্বপ্ন, আরাম-আয়েশ সবকিছু বিসর্জন দেওয়ার নামই মা। বিশ্ব মা দিবসে পৃথিবীর নানা প্রান্তে মায়েদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে নানা আয়োজন থাকলেও রংপুর জেলার ৮ উপজেলার মধ্যে ৪ উপজেলার উপর দিয়ে রেলসংযোগ রয়েছে। রেলসংযোগ উপজেলাগুলো হলো বদরগঞ্জ, রংপুর সদর, কাউনিয়া, পীরগাছা । এসব উপজেলার রেললাইনের ধারে বসবাস করা কিছু মায়ের জীবনে এ দিনটি আসে নীরব বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। তাদের কাছে মা দিবস কোনো উৎসব নয় বরং প্রতিদিনের সংগ্রাম, সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধ এবং অনিশ্চিত জীবনের মাঝেও সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার আরেকটি দিন। রংপুর রেলস্টেশনসহ রেলসংযোগ ৪ উপজেলার রেললাইন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় রেললাইনের দুই ধারে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর। টিন, পলিথিন, পুরোনো কাপড় আর বাঁশ দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরেই বসবাস করছে শতাধিক পরিবার। দিন-রাত ট্রেনের শব্দ, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বৃষ্টিতে পানি ঢুকে পড়া, শীতে কনকনে ঠান্ডা আর গরমে অসহনীয় তাপদাহ সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই সন্তানদের আগলে রাখছেন এসব মায়েরা। বিশ্ব মা দিবসে রংপুরের রেললাইনের ধারে ঘুরে দেখা যায়, সকাল হওয়ার আগেই শুরু হয় তাদের জীবনযুদ্ধ। কেউ বাসাবাড়িতে কাজ করতে ছুটছেন, কেউ শহরের বিভিন্ন স্থানে কাগজ-প্লাস্টিক কুড়াতে যাচ্ছেন, কেউ আবার অন্যের বাড়িতে কাপড় ধোয়া কিংবা রান্নার কাজ করেন। সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পর যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা আর ওষুধের খরচ।রেললাইনের পাশের ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস করেন রহিমা বেগম। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সংসারের পুরো দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। তিন সন্তানকে নিয়ে তার প্রতিদিনের লড়াই যেন শেষ হয় না। মা দিবসের কথা তুলতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, আমাদের জীবনে উৎসব বলতে কিছু নাই। প্রতিদিন চিন্তা করি, আজ বাচ্চাগুলারে কী খাওয়ামু। নিজের জন্য কিছু ভাবি না। আমার স্বপ্ন, আমার সন্তানরা যেন লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হয়। ওরা যেন এই কষ্টের জীবন থেকে বের হতে পারে। তার পাশের ঘরেই থাকেন জোসনা বেগম। স্বামী রিকশাচালক। অনিয়মিত আয়ে চার সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে পড়ে, অনেক সময় রাতভর জেগে সন্তানদের কোলে নিয়ে বসে থাকতে হয়। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে ট্রেনের জন্য। ছোট বাচ্চাগুলারে চোখের আড়াল করতে পারি না। কাজেও গেলে মনে ভয় কাজ করে। তারপরও চাই ওরা স্কুলে যাক, ভালো মানুষ হোক। আমাদের মতো কষ্ট যেন ওদের না করতে হয়।

‎রেললাইনের ধারে বসবাসকারী মায়েদের জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। ট্রেন চলাচলের সময় ছোট শিশুদের সামলাতে গিয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের। শিশুদের খেলাধুলার জায়গা নেই, নিরাপদ পরিবেশ নেই। অনেক সময় অল্প বয়সী শিশুরা রেললাইনের আশপাশে খেলতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবারই হতদরিদ্র। কারও নিজস্ব জমি বা স্থায়ী বাড়ি নেই। জীবিকার তাগিদে শহরে এসে রেললাইনের ধারে অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও বছরের পর বছর ধরে সেখানেই কাটছে তাদের জীবন। অনেক পরিবার আবার নদীভাঙন কিংবা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্ব হারিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবেন মায়েরাই। অভাবের সংসারেও তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন। অনেক শিশু বই-খাতা কিংবা স্কুলড্রেসের অভাবে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। কেউ কেউ আবার পরিবারের আয় বাড়াতে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়ে। সালেহা খাতুন নামের এক মা বলেন, আমি নিজে লেখাপড়া করতে পারি নাই। তাই চাই আমার মেয়েটা পড়াশোনা করুক। প্রতিদিন কাজ করে যা পাই, সেখান থেকে একটু একটু করে ওর জন্য রাখি। মেয়েটা যেন বড় হয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে। আরেক মা আমেনা বেগম বলেন, সন্তানদের মুখের দিকে তাকাইলেই সব কষ্ট ভুলে যাই। অনেক সময় নিজেরা না খেয়ে থাকি, কিন্তু বাচ্চাদের না খাইয়ে রাখতে পারি না। মা তো এমনই।রেললাইনের ধারে বেড়ে ওঠা শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম নয়। বিশুদ্ধ পানির অভাব, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। তবুও সামর্থ্যের অভাবে অনেক পরিবার ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারে না। সন্তান অসুস্থ হলে মায়েদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়।

‎স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন, সুবিধাবঞ্চিত এসব পরিবারের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আবাসন ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি।সমাজকর্মী আব্দুল কাদের বলেন, রেললাইনের ধারে বসবাস করা মায়েরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের জীবন পার করছেন। প্রতিনিয়ত তারা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন। অথচ তাদের জীবনমান উন্নয়নে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। মা দিবসে শুধু শুভেচ্ছা জানালেই হবে না, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। শিক্ষাবিদদের মতে, দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে হলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ শিক্ষা ছাড়া এসব শিশুদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। বিশ্ব মা দিবসে রংপুরের রেললাইনের ধারে বসবাস করা এসব মায়েদের জীবনের গল্প যেন একেকটি সংগ্রামের মহাকাব্য। নিজেদের না পাওয়া, অপূর্ণতা আর কষ্টগুলো বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে তারা প্রতিদিন সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করছেন। অমানবিক পরিবেশ, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা স্বপ্ন দেখেন একদিন হয়তো তাদের সন্তানরা এই রেললাইনের ধারের অন্ধকার জীবন পেরিয়ে আলোর পথে হাঁটবে। মা দিবসে তাদের একটাই প্রত্যাশা সমাজ ও রাষ্ট্র যেন তাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও মানবিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...