সোনালী ধানের শীষেই চুয়াডাঙ্গার কৃষকের হাসি আনন্দ

Date:

spot_img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

বুক ভরা স্বপ্ন বুনে জমিতে সোনালী ধান রোপণ করেছিলেন চুয়াডাঙ্গার কর্মঠ কৃষকেরা। ঘাম ঝরানো শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পেলেই পরিবার পরিজন নিয়ে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যে কাটবে আগামী দিনগুলো এমনটাই আশা তাদের। চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধু সোনালী প্রান্তরের মায়াবী হাতছানি। বোশেখী খরতাপে লু-বাতাসের সঙ্গে সোনালী ধানের শীষে মাঠে মাঠে দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন। ধানের শীষ আর সেই দোলাতেই লুকিয়ে আছে হাজারো কৃষকের রঙিন ভালবাসা, হাসি আর সকল আনন্দ। তপ্ত দুপুরে দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ, সেই সতেজ ঘ্রাণ আর ঢেউ খেলানো দৃশ্য জানান দিচ্ছে, আর মাত্র কদিন পরই কৃষকের উঠান ভরে উঠবে মুঠো মুঠো উৎসবে। সেথায় আছড়ে পড়বে সোনালী ধান। ভরে উঠবে কৃষকের গোলা। মুখে ফুঁটবে সোনালী হাসি।

সরেজমিনে জেলার সব এলাকার মাঠে সোনামাখা ধানের ক্ষেত ঘুরে ঘুরে দেখা গেছে, একই চিত্র। আলমডাঙ্গা উপজেলা জুড়ে ধানের মাঠ, সবুজ থেকে হলুদ বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। আর মাত্র কয়েকদিনের পরেই ধান কেটে ঘরে তোলা শুরু হবে । বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মাঠেই ধানের শীষে পাক ধরেছে। আবার কোন কোন মাঠে সবুজ শীষও এখনও বিদ্যমান।

দামুড়হুদা উপজেলায় রোপা আমন ধানের পর রবি ফসলের চাষ হয় প্রচুর। এজন্য বোরো ধান রোপণ করে থাকে এলাকার কৃষকেরা। কিন্তু এবার বৃষ্টির অপেক্ষায় কিছুটা দেরিতে রোপণ করতে হয়েছিল। বেশির ভাগ কৃষক সেচের পানিতেই রোপন করে ফেলেন। যার কারণে বাড়তি খরচও গুণতে হয়েছে। যদিও মাঝে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় স্বস্তি মিলেছে তাদের। এর পরেও এবার ধান চাষাবাদে কৃষকদের দ্বিগুণের বেশি খরচ গুণতে হচ্ছে। সেচের পানিতে রোপণসহ, বাড়তি দামে কিনে সার কীটনাশক ব্যবহার কৃষকদের মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো হয়ে আছে।

চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, এবার বোরো ধান রোপন করা থেকে শুরু করে পরিচর্যায় খরচ বেশি হয়েছে। আর কিছুদিন পর পাকা ধান ঘরে উঠবে সেই অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা। আবাদ ভাল হলেও সেচ নিয়ে কৃষকদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে,এখন লোডশেডিং চলছে কিছুদিন আগেও কৃষকরা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎসেবা পেয়েছেন কিন্তু এখন প্রতিদিন কমপক্ষে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা লোডশেডিং চলছে। আবার যেখানে ডিজেলচালিত মেশিনের ওপর সেচকাজ নির্ভর, সেখানে কৃষকরা পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না। কৃষকদের দাবি, ধান উৎপাদনে সেচ, শ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। ঝাঁঝালো রোদের মাঝে মাঠে মাঠে সবুজ আর সোনালী ধানের আগমনী বার্তা যেন কৃষকদের মনে নির্মল আনন্দের আবহ বয়ে নিয়ে এসেছে। এছাড়াও এই বছরে ধানের বাম্পার ফলন হবে এবং বেশি দামে ধান বিক্রি করবে বলে আশা করছেন কৃষকেরা।

আলমডাঙ্গা উপজেলার পারদূর্গা পুর গ্ৰামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ধান আবাদে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। ফলনও বাম্পার হয়েছে। আমার জমিতে ধান কাটা শুরু করেছি। আশা করছি ঝড়-বৃষ্টি না হলে আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে সব ধান ঘরে তুলতে পারব। শুনেছি বাজারে দাম ভালো। আশা করছি এবার লাভ হবে।’

দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ুলগাছি গ্রামের ধানচাষি ইয়াকুব আলি বলেন, ‘আমার ছয় বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। শুরুর দিকে পানি না পেলেও পরে যথেষ্ট পানি পেয়েছি। প্রায় জমির ধান পেকে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যে ধান কাটা-মাড়াই শুরু করব।

দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, এ উপজেলায় চলতি বছরে ৮ হাজার ৭৫৭হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮হাজার ৭৫৭ হেক্টর। এখনো পর্যন্ত কৃষকদের ধান ভালো পর্যায়ে আছে। অফিস থেকে কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকেরা সঠিক সময় ধান কেটে ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছি। সারা বছরের সব কষ্ট ভুলে যায় এই সোনারঙা ধানের শীষ দেখলে।

জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, উপজেলায় ৭ হাজার ২৬২হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর। এবছর বোরো ধান চাষ বেশী হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কৃষকদের ধান ভালো পর্যায়ে আছে, আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে কৃষকেরা কাঙ্খিত ফলন পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কাজেই কৃষক সঠিক সময় ধান কেটে ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছি।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, ‘বোরো ধানের সেচ নিয়ে আমাদের কাছে এখনো পর্যন্ত কোনো কৃষক অভিযোগ করেননি। এখন লোডশেডিং হলেও কয়েকদিন আগেও কৃষকরা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎসেবা পেয়েছেন। আবার যেখানে ডিজেলচালিত মেশিনের ওপর সেচ নির্ভর, সেখানে কৃষকরা পর্যাপ্ত ডিজেল পেয়েছেন। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের সমন্বয়ে কৃষক সুবিধা মতো বোরো ধানে সেচ দিতে পেরেছেন। এবার বোরো মৌসুমে জেলায় ৩৫ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। ফলনও খুব ভাল হয়েছে। ভুট্টা কর্তন করার ফলে সেই জমিতে কৃষকরা পাট চাষ করেছে। পাট কেটে সেই আবার জমিতে ধান চাষ করেছেন তারা। জেলার কৃষি বিভাগ কৃষকদের নানা ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বলে জানান কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...