
আলী কদর পলাশ
জাতীয় সংসদ কোনো সাধারণ বিতর্কের মঞ্চ নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি আচরণ এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জনগণের প্রত্যাশা, গণতন্ত্রের চর্চা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সেই সংসদেই যদি নিয়মের শৈথিল্য, আচরণগত অসংযম এবং কার্যপ্রণালিগত দুর্বলতা চোখে পড়ে, তবে তা উদ্বেগেরই বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে সংসদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা হলো নবীন এমপিদের অনভিজ্ঞতা সংসদে শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
নতুন সদস্যদের সংসদে আসা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটে, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়ে এবং গণতন্ত্রে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা, বিধিবিধান মেনে বক্তব্য দেওয়া, সময়সীমা অনুসরণ করা, আলোচ্যসূচির ভেতরে থেকে মতামত উপস্থাপন করা এবং সংসদীয় ভাষার শালীনতা বজায় রাখা কোনো সহজ বিষয় নয়। এসবের জন্য প্রয়োজন প্রস্তুতি, চর্চা, ধৈর্য এবং সংসদীয় সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। সেই জায়গাতেই ঘাটতির লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে।
বিভিন্ন অধিবেশনে দেখা গেছে, অনেক নবীন সদস্য বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত সংযম বজায় রাখতে পারছেন না। কখনও নির্ধারিত সময়ের সীমা অতিক্রম করছেন, কখনও আলোচনার মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছেন, আবার কখনও সংসদীয় আচরণের পরিমিতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ফলে স্পিকারকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। এতে সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং আইন প্রণয়নের মতো গুরুতর কাজেও অপ্রয়োজনীয় ধীরগতি তৈরি হচ্ছে। সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্ক অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই বিতর্ক যদি শৃঙ্খলার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে না থাকে, তবে তা কার্যকর গণতান্ত্রিক চর্চার বদলে বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।
তবে এ অবস্থার দায় শুধু নবীন সদস্যদের ওপর চাপিয়ে দিলেই চলবে না। যারা প্রথমবার সংসদে এসেছেন, তাদের জন্য কার্যকর ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি ছিল। সংসদীয় বিধি, কার্যপ্রণালি, আইন প্রণয়নের ধাপ, কমিটির কাজ, সংসদীয় ভাষার ব্যবহার এবং আচরণগত রীতিনীতি সম্পর্কে তাদের একটি সুসংগঠিত ধারণা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বাস্তবে যদি সেই প্রস্তুতি সীমিত থাকে, তবে অনভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটবেই। অর্থাৎ সমস্যাটি ব্যক্তি-দুর্বলতার যেমন, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতিরও।
এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এমপিদের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ কেবল আইন তৈরির জায়গা নয়, এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতারও একটি বিদ্যালয়। সিনিয়র সদস্যরা যদি নতুনদের প্রতি সহনশীল ও সহায়ক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসেন, সংসদীয় রীতিনীতি সম্পর্কে হাতে-কলমে দিকনির্দেশনা দেন, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি দ্রুত সম্ভব। একই সঙ্গে সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নবীন সদস্যদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ওরিয়েন্টেশন এবং ব্যবহারিক কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক পরিচিতিমূলক সেশন দিয়ে এই ঘাটতি পূরণ হবে না।
সংসদ সদস্যদের মনে রাখা প্রয়োজন, তারা সেখানে ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশের জন্য যাননি, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য গেছেন। তাদের প্রতিটি বক্তব্য ও আচরণ জনগণের কাছে সংসদের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। তাই দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শেখার মানসিকতা ছাড়া একজন কার্যকর সংসদ সদস্য হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। নবীনতা কোনো সমস্যা নয়, যদি তার সঙ্গে থাকে শেখার আগ্রহ। কিন্তু সেই নবীনতা যদি শৃঙ্খলার দুর্বলতায় পরিণত হয়, তবে তা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সংসদকে অবশ্যই কার্যকর, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং মর্যাদাপূর্ণ রাখতে হবে। নবীন এমপিদের উদ্যম দেশের জন্য সম্পদ হতে পারে, যদি তা সঠিক দিকনির্দেশনা ও সংসদীয় শিষ্টাচারের মধ্য দিয়ে পরিপক্ব হয়ে ওঠে। এখন প্রয়োজন দোষারোপ নয়, প্রয়োজন শুদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্বশীলতার চর্চা। তাহলেই সংসদ তার কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা ফিরে পাবে এবং জনগণের আস্থার স্থান হিসেবে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।





