
আলী কদর পলাশ
আজ পহেলা বৈশাখ। প্রকৃতিতে রুদ্র ঝড়ের তান্ডব শেষে যখন ভোরের স্নিগ্ধ আলো নতুন বছরের বার্তা নিয়ে আসে, তখন বুকের গহীনে নস্টালজিয়ার এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে। আজ থেকে ৩৩ বছর আগের ঠিক এমন এক দিনে, ১৪০০ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে ঝিনাইদহ জেলার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়েছিল এক নতুন সংবাদের ঘ্রাণে। জন্ম নিয়েছিল ঝিনাইদহ জেলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংবাদপত্র ‘দৈনিক ঝিনাইদহ’।


আজ যখন ডিজিটাল স্ক্রিনে খবরের মিছিল দেখি, তখন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করে সেই ধূসর দিনগুলোতে, যেখানে সাংবাদিকতা ছিল কেবল পেশা নয়, বরং একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

আমার সাংবাদিকতা ও প্রকাশনা জীবনের গোড়াপত্তন হয়েছিল চুয়াডাঙ্গার মাটি থেকে। ১৯৯১ সালের ১০ জুন চুয়াডাঙ্গা জেলার প্রথম দৈনিক হিসেবে যখন প্রতিষ্ঠা করি ‘দৈনিক মাথাভাঙ্গা’, তখন সম্বল বলতে ছিল এক বুক সাহস আর লেটার প্রেসের সিসার অক্ষরগুলো। সেই অভিজ্ঞতার রেশ ধরে ১৯৯২ সালের পহেলা জানুয়ারি আনলাম ‘সাপ্তাহিক এই আমার দেশ’। পরবর্তীতে যা দৈনিক উন্নীত হয়। যেটি এখন পড়ছেন।
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে তখন হৃদয়ের ভেতরে এক অদ্ভুত তাগিদ ছিল প্রতিবেশী জেলা ঝিনাইদহের মানুষের জন্য কিছু করার। সেই তাগিদ থেকেই জন্ম নেয় ‘দৈনিক ঝিনাইদহ’।
মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন আজকের মতো হাতের মুঠোয় পৃথিবী ছিল না। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ছিল পদে পদে। আমাদের পত্রিকা ছাপা হতো খুলনার বিখ্যাত ‘পূর্বাঞ্চল’ প্রেসে।
সারাদিন সংবাদ সংগ্রহ, হাতে লিখে কম্পোজ করা, আর বিকেলে সেই ম্যাটার নিয়ে খুলনায় ছোটছুটি- সে এক অন্যরকম উন্মাদনা।
রাতভর প্রেসে বসে থেকে ভোরের আলো ফোটার আগে যখন পত্রিকার প্রথম কপিটি হাতে আসত, তখন শরীরের সব ক্লান্তি যেন ওই নতুন কালির গন্ধে কর্পূরের মতো উড়ে যেত।
ঝিনাইদহ জেলার মানুষের হাতে তাদের নিজেদের ভাষায় লেখা প্রথম দৈনিকটি পৌঁছে দেওয়ার আনন্দ ছিল যেকোনো প্রাপ্তির চেয়ে বড়। অবশ্য পরে ঝিনাইদহ থেকেই কম্পোজ হতো। আনোয়ার ভাইয়ের প্রেসে।
এই মহতী যজ্ঞে আমার সাথে যারা সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন, আজ তাদের নাম পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। আমাদের সম্পাদক অধ্যক্ষ আমিনুর রহমান টুকু, উপদেষ্টা সম্পাদক নুরুজ্জামান মণ্টু, নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা মাজেদ এবং বার্তা সম্পাদক মিজানুর রহমান বাবুল, স্যুটেড বুটেড আসিফ কাজল, তৎকালীন মেয়র আনিসুর রহমান খোকা, হলিধানী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এডভোকেট এনামুল হক নিলু। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন এক একজন স্তম্ভ। আমি ছিলাম নগণ্য এক প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক।
আমার অর্থনৈতিক সংকট এবং শিল্পপতি খায়রুল বাশারের কৌশলে মালিকানা গ্রহণ পত্রিকাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল?
আজ পহেলা বৈশাখের এই শুভক্ষণে যারা আমাদের মাঝে নেই, সেই সব গুণী মানুষদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তাঁদের ত্যাগ আর মেধা মিশে আছে এই পত্রিকার প্রতিটি ছত্রে।
একটি সংবাদপত্র কেবল খবর ছাপার কাগজ নয়, এটি একটি জনপদের দর্পণ, ইতিহাসের সাক্ষী। ‘দৈনিক মাথাভাঙ্গা’ ‘এই আমার দেশ’ থেকে ‘দৈনিক ঝিনাইদহ’ -এই দীর্ঘ পথচলায় আমরা কেবল খবর দেইনি বরং মানুষের স্বপ্ন আর যন্ত্রণাকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছি।
বৈশাখের সেই রুদ্র রূপ যেমন জরাজীর্ণকে ধুয়ে-মুছে দিয়ে নতুনের জয়গান গায়, আমরাও চেয়েছিলাম সংবাদপত্রের মাধ্যমে সমাজের অন্ধকার দূর করতে।
আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই ভোরে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, সময় কত দ্রুত বয়ে যায়! তবে কবিতার সেই অমোঘ সত্য আজও প্রাসঙ্গিক। -“যতই ঝড় উঠুক সাগরে, তবু তরী বাইতে হবে”। -সেই তরী বাওয়ার নেশাতেই আজও কলম সচল রেখেছি। আজকের এই বিশেষ দিনে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই আমার অগণিত পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি, যারা দীর্ঘ তিন দশক ধরে আমার এই সাংবাদিকতা জীবনের সাথী হয়েছেন।
নতুন বছর বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ।
আমাদের সাংবাদিকতার এই নিরন্তর অভিযাত্রা যেন কখনোই পথ না হারায়। জীর্ণ পুরাতন বিদায় নিক, জয় হোক নতুনের।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩।





