
আলী কদর পলাশ
এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের অঙ্ক নয়। এটি ছিল জাতির আত্মপরিচয়ের পরীক্ষা। চার দশক ধরে রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল দুই নাম। শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া। এবার সেই দৃশ্য অনুপস্থিত। একজন ইতিহাসের বাইরে চলে গেছেন মৃত্যুর কারণে। আরেকজন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশছাড়া। এই শূন্যতায় দেশ ভোট দিল। এবং জানাল- বাংলাদেশ এখনও অসাম্প্রদায়িক, এখনও প্রগতিশীল জীবনবোধ পুরো ত্যাগ করেনি।
মুক্তিযুদ্ধ শুধু ভূখণ্ডের জন্য ছিল না। ছিল মর্যাদা, মানবিকতা ও বহুত্ববাদের রাষ্ট্রচিন্তার জন্য। সময় বদলেছে, ভাষা বদলেছে কিন্তু জাতির মেরুদণ্ড ভাঙেনি। এবারের ভোট তার প্রমাণ।
আশঙ্কা ছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি একক শক্তি হয়ে উঠবে। কিন্তু প্রাথমিক ফল সে ছবি দেয় না। জোট আছে, একক আধিপত্য স্পষ্ট নয়। অর্থাৎ মানুষ এখনও সহাবস্থানের বাংলাদেশ চায়। যেখানে ধর্ম নয়, অধিকার বড়। নাগরিক পরিচয়ই শেষ কথা।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের উত্থান। প্রথম সরাসরি নির্বাচনে দুই আসনে জয়। বিএনপি প্রাথমিকভাবে ২১০ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এটি শক্ত ম্যান্ডেট। এবং বড় দায়।
এটি কি শুধু উত্তরাধিকার, নাকি নতুন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার সুযোগ- প্রশ্ন সেখানেই। মানুষ এখন মুখ নয়, মানদণ্ড চায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার জয়ও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখায় ভোটার শুধু জোটের অঙ্ক দেখে না। ব্যক্তি-যোগ্যতাও বিবেচনায় আনে। সমঝোতা কাগজে সহজ, ম্যান্ডেট মানুষের হাতে।
তরুণ নেতৃত্বের প্রবেশ আরেক সিগন্যাল। নুরুল হক নূর, নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহদের জয় জানায়- রাজনীতি আরও বহুমাত্রিক হবে। সংসদ কার্যকর থাকলে জবাবদিহি বাড়বে।
ভোটার সমাজচিত্রও দেখেন। নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র। কট্টরতা প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। মানুষ চায় সংযত, মানবিক রাষ্ট্র। এটাই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মনস্তত্ত্ব।
এখন দায় সরকারের। প্রতিহিংসা নয়, সংসদীয় বিতর্ক। পেশাদার প্রশাসন। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা। নারীর অধিকারকে নীতিতে রূপ। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলাই হবে প্রথম পরীক্ষা। ক্ষমতার ব্যবহারই ইতিহাস লেখে।
হাসিনা–খালেদা বিহীন এই নির্বাচন নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ পরিবর্তন চায় কিন্তু সহাবস্থান ভেঙে নয়। নতুন দিগন্ত চায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করে নয়।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা একটাই। ম্যান্ডেট ক্ষমতার নয়, চরিত্রের অঙ্গীকার। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সেটিই আবার মনে করিয়ে দিল।
সকাল ৯:০০ টা
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা।





