
ফরিদুল ইসলাম
একটি শিশুর চোখে পৃথিবী মানে অফুরন্ত সম্ভাবনা, নতুন কিছু জানার কৌতূহল আর নিরাপদে বেড়ে ওঠার স্বপ্ন। তার কাছে পরিবার আশ্রয়, বিদ্যালয় আনন্দের জায়গা এবং সমাজ নির্ভরতার প্রতীক। কিন্তু এই স্বপ্নের পৃথিবী যখন নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, অনলাইন প্রতারণা, অপুষ্টি ও অবহেলার শিকার হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—শিশুর জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের সমাজ আসলে কতটা প্রস্তুত? শিশুর নিরাপত্তা শুধু তাকে শারীরিক আঘাত থেকে রক্ষা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মানসিক সুস্থতা, পুষ্টি, শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়; তাকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে সে ভয় ছাড়া শিখতে পারবে, নিজের কথা বলতে পারবে এবং সম্ভাবনাময় মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে নারী ও শিশুদের অনুকূলে বিশেষ বিধান গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩ শিশুর সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ এবং বাংলাদেশে প্রযোজ্য অন্যান্য আইনও শিশুদের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদেও অনুসমর্থন জানিয়েছে। কাগজে-কলমে এসব আইন ও অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব পরিস্থিতি আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে। শিশু নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির মতো ঘটনা প্রমাণ করে, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তার কার্যকর প্রয়োগও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক লোকলজ্জা, প্রভাবশালীদের চাপ, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থার অভাবে অপরাধের শিকার শিশু ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুর অধিকার রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।

আমরা প্রায়ই অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে শিশুকে সাবধান থাকতে বলি। কিন্তু শিশুর প্রতি নির্যাতন বা যৌন নিপীড়নের ঘটনা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন কিংবা শিশুর আস্থাভাজন ব্যক্তির মাধ্যমেও ঘটতে পারে। তাই নিরাপত্তার শিক্ষা দিতে হবে বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে—ব্যক্তির পরিচয় নয়, তার আচরণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতার ভিত্তিতে। শিশুকে মারধর, অপমান, ভয় দেখানো কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করে হেয় করা তার আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক পরিবারে শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না; তার ভয়, অস্বস্তি কিংবা অভিযোগকে দুষ্টুমি ভেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ শিশু কোনো ঘটনা জানালে তাকে মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিশ্বাসযোগ্যভাবে বিষয়টি যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা অভিভাবকের দায়িত্ব। প্রতিটি পরিবারে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিশু কোনো বিপদে পড়লে নির্ভয়ে মা-বাবা বা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্কের কাছে বলতে পারে। তাকে বোঝাতে হবে, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, ভয় দেখানো কিংবা গোপন রাখতে বাধ্য করা কোনো বিষয়েই তার দোষ নেই। একই সঙ্গে শিশুর বয়স ও বোধগম্যতা অনুযায়ী ব্যক্তিগত সীমারেখা, নিরাপদ স্পর্শ এবং সাহায্য চাওয়ার উপায় শেখাতে হবে।
বিদ্যালয় শিশুর দ্বিতীয় পরিবার। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; তাঁর আচরণ, ভাষা ও মূল্যবোধ শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং, শারীরিক শাস্তি, অপমান, যৌন হয়রানি কিংবা সহপাঠীদের দ্বারা মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে শিশুর শেখার আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশুবান্ধব অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, কার্যকর আচরণবিধি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগকারী শিশুকে দোষারোপ করা বা তার পরিচয় অপ্রয়োজনে প্রকাশ করা যাবে না। শিক্ষক, কর্মচারী ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিদ্যালয়ের শৌচাগার, যাতায়াতপথ, খেলার মাঠ ও আশপাশের পরিবেশও নিরাপদ রাখতে হবে। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় পর্যাপ্ত শিক্ষক, নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখার জন্য ভয় নয়, আনন্দময় শিক্ষা ও মানবিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যতের পথে বড় বাধাগুলোর মধ্যে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম অন্যতম। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, কুসংস্কার, যৌতুকের ভয়, কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য এবং শিক্ষার সুযোগের অভাব অনেক পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকটের কারণে বহু শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়। তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় কাজ করে, অথচ পর্যাপ্ত বিশ্রাম, শিক্ষা, পুষ্টি কিংবা নিরাপত্তা পায় না। শিশুশ্রম বন্ধ করতে শুধু নিয়োগকর্তাকে শাস্তি দিলেই হবে না; দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, অভিভাবকের কর্মসংস্থান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখার কার্যকর উদ্যোগ এবং ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে শনাক্ত করা, আইন প্রয়োগ এবং পরিবারকে সচেতন করার উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বিত ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও ও ডিজিটাল বই তাদের জ্ঞান অর্জনের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা, অপরিচিত ব্যক্তির প্রলোভন, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার এবং বয়স-অনুপযোগী কনটেন্টের ঝুঁকিও বেড়েছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিলেও তার ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা দেন না। আবার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা বকাঝকার কারণে শিশুরা অনলাইনে বিপদে পড়লেও তা গোপন রাখতে পারে। তাই শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং বয়সোপযোগী ডিজিটাল শিক্ষা, গোপনীয়তা রক্ষার অভ্যাস, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, অপরিচিত লিংক এড়িয়ে চলা এবং অনলাইনে কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে বিশ্বস্ত বড়দের জানানোর শিক্ষা দিতে হবে। অভিভাবকদেরও সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, তবে তার ব্যক্তিগত মর্যাদা ও বয়সোপযোগী স্বাধীনতাকে সম্মান করে।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফল শিশুর সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী—৮৫.৭ শতাংশ শিশু: ১–১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে আগের এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। ৮৫.৭ শতাংশ শিশু: ১–১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে আগের এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। ৯.২ শতাংশ শিশু: ৫–১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমে যুক্ত। ৪৭.২ শতাংশ নারী: ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে। ৫৯.২ শতাংশ শিশু: পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্ম নিবন্ধিত হয়েছে। উল্লিখিত পরিসংখ্যানগুলো যথাক্রমে সহিংস আচরণ, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে। এই সংখ্যাগুলোকে নিছক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর অভিজ্ঞতা, একটি পরিবারের সংকট এবং সমাজের কোনো না কোনো পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের ঘাটতি। বিশেষ করে শারীরিক শাস্তি ও মানসিক আগ্রাসনের উচ্চ হার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুকে শাসন করার নামে সহিংস আচরণকে স্বাভাবিক ভাবার সংস্কৃতি বদলানো জরুরি।
নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি হয় শিশুর জন্মের আগেই। মায়ের পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব, নবজাতকের যথাযথ যত্ন, টিকাদান, বিশুদ্ধ পানি এবং পুষ্টিকর খাবার শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, দূষিত পানি ও পরিবেশগত বিষাক্ত উপাদান শিশুর শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ইউনিসেফ ও বিবিএসের ২০২৫ সালের জরিপে ১২–৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮.৪ শতাংশের রক্তে সীসার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেশি পাওয়া গেছে। একই জরিপে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার হার ৪৩.৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা, নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা এবং সীসাসহ ক্ষতিকর পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা এবং সুরক্ষাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। প্রথমত, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। শিশুকে সময় দিতে হবে, তার কথা শুনতে হবে এবং ভুল করলে অপমান বা মারধরের পরিবর্তে যুক্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমে বোঝাতে হবে। শিশুর আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ভয় কিংবা কারও কাছে যেতে অনীহা দেখা দিলে সংবেদনশীলতার সঙ্গে কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে বুলিং ও হয়রানি প্রতিরোধের নীতিমালা, গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের শিশু অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য ও ইতিবাচক শৃঙ্খলা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে হবে। শিশু নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, পাচার, বাল্যবিবাহ ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। অপরাধীর সামাজিক অবস্থান বা পরিচয় যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা দিতে হবে। চতুর্থত, স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত ও সহায়তা করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু কমিটি গঠন নয়, নিয়মিত সভা, দায়িত্ব বণ্টন, অভিযোগের অনুসরণ এবং ফলাফল মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের পেছনে অর্থনৈতিক সংকট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই অসচ্ছল পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তি, বিদ্যালয়ে খাবারের ব্যবস্থা, অভিভাবকের কর্মসংস্থান এবং ঝরে পড়া শিশুদের পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। ষষ্ঠত, শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের বয়স ও পরিপক্বতা অনুযায়ী মতামত শুনতে হবে। বিদ্যালয়, পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সমস্যা প্রকাশের নিরাপদ সুযোগ দিতে হবে। শিশুদের কেবল সুরক্ষার বিষয় হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবেও দেখতে হবে। সপ্তমত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে চাঞ্চল্য সৃষ্টি বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে অপরাধের প্রকৃতি, প্রতিরোধের উপায় এবং জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর উদ্যোগকে সমন্বিত করতে হবে এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো শিশু দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষাবঞ্চিত হবে না, বাল্যবিবাহের শিকার হবে না, জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামতে বাধ্য হবে না। যে সমাজে কন্যাশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুরা বৈষম্যের শিকার হবে না; বিদ্যালয়ে শারীরিক শাস্তি বা বুলিংয়ের ভয় থাকবে না; অনলাইনে বিপদে পড়লেও শিশু সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করবে না। এ জন্য রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিশু সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রয়োজন। বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার, মাঠপর্যায়ের সেবার মান, অভিযোগ নিষ্পত্তির সময় এবং শিশুদের বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি শিশু নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং সেসব তথ্যের ভিত্তিতে নীতি সংশোধন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর প্রতি সহিংসতা দেখেও নীরব থাকার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে পাশে দাঁড়ানো, নিরাপদ উপায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
শিশুরা শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়; তারা আজকের সমাজেরও সমান মর্যাদাসম্পন্ন সদস্য। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি অধিকার এবং রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। আইন আছে, নীতিমালা আছে, উন্নয়নের অঙ্গীকারও আছে। কিন্তু শিশুরা যদি ঘরে, বিদ্যালয়ে, রাস্তায় কিংবা ডিজিটাল জগতে নিরাপদ বোধ না করে, তবে আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি শিশুর কান্না, ভয় কিংবা নীরব অভিযোগকে অবহেলা করার অর্থ হলো ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে হলে প্রথমে আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। শিশুকে ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবেসে; দমন করে নয়, মর্যাদা দিয়ে; অবহেলা করে নয়, দায়িত্ব নিয়ে বড় করতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে কার্যকর সুরক্ষা, পরিবারকে দিতে হবে ভালোবাসা, বিদ্যালয়কে গড়ে তুলতে হবে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ এবং সমাজকে হতে হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমাদের প্রস্তুতির প্রকৃত পরীক্ষা উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়, বরং একটি শিশু কতটা নিরাপদে হাসতে, শিখতে, খেলতে এবং স্বপ্ন দেখতে পারছে—তার মধ্যেই। শিশুর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়তে পারলেই আমরা সত্যিকার অর্থে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারব।

লেখক: ফরিদুল ইসলাম, চিন্তক, কবি ও প্রাবন্ধিক।





