
আলী কদর পলাশ
মার্কিন নৌবহর পশ্চিম এশিয়ার দিকে এগোচ্ছে—এই একটি বাক্যই এখন অঞ্চলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ সামরিক শক্তি যখন “জাস্ট ইন কেস” যুক্তিতে সামনে আনা হয়, তখন প্রতিপক্ষ তা প্রায়ই পড়ে “জাস্ট বিফোর” হিসেবে—আক্রমণের ঠিক আগের প্রস্তুতি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের “আরমাডা” পাঠানোর ঘোষণা ও “প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হতে পারে”–জাতীয় বক্তব্য, আর অন্য দিকে তেহরানের স্পষ্ট বার্তা—যে কোনও হামলাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ধরে কঠোর প্রত্যাঘাত—দুই মিলে যে পরিবেশ তৈরি করছে, তা সংঘাতের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক: ভুল বোঝাবুঝি থেকে জন্ম নেওয়া সংঘাতের পরিবেশ।
এই উত্তেজনার পটভূমিতে একটি বাস্তব সত্য আছে: পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ সাধারণত “ঘোষণা দিয়ে” শুরু হয় না; শুরু হয় ঘটনাপ্রবাহে। একটি ড্রোন ভূপাতিত, একটি নৌযানের খুব কাছে চলে আসা, কোনও মিত্রঘাঁটিতে ‘অজ্ঞাত’ হামলা, অথবা “সার্জিক্যাল” বলে চালানো সীমিত আঘাত—তারপর পাল্টা আঘাত ক্রমশ বড় হতে থাকে। ইরানের ঘোষণাটি তাই উদ্বেগজনক—“ছোট বা বড়, সীমিত বা সার্জিক্যাল”—সবকিছুকেই যুদ্ধ হিসেবে ধরার অবস্থান একদিকে সাহসী শোনালেও, অন্যদিকে সংঘাতকে দ্রুত ‘ফুল-স্কেল’ পর্যায়ে ঠেলে দেওয়ার শর্টকাট।
ওয়াশিংটনের যুক্তি হচ্ছে—এটা প্রতিরোধমূলক মোতায়েন; মিত্রদের নিরাপত্তা, নৌপথের সুরক্ষা, এবং ইরানকে বার্তা দেওয়া যে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। কিন্তু প্রতিরোধনীতি তখনই কার্যকর, যখন এর সঙ্গে থাকে সংলাপের দরজা। নৌবহর এগোনো একা “ডিটারেন্স” হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে “প্রোভোকেশন”-ও হতে পারে—বিশেষত এমন সময়ে, যখন ইরানের ভেতরে অস্থিরতা ও দমননীতির অভিযোগ ঘনিয়ে উঠছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও তার প্রতিক্রিয়ায় অবস্থান কঠোর করছে। এই দ্বিমুখী চাপ—ঘরোয়া রাজনীতি ও আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণ—কূটনৈতিক স্পেস সংকুচিত করে, সামরিক স্পেস বাড়ায়।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, এই উত্তেজনার খেসারত শেষ পর্যন্ত দেবে সাধারণ মানুষ—শুধু ইরান বা আশপাশের দেশগুলো নয়, বিশ্বের অর্থনীতিও। পশ্চিম এশিয়ায় বড় সংঘাতের ইঙ্গিত মাত্রই জ্বালানির বাজারে কাঁপুনি ধরায়; তেলের দামে অস্থিরতা মানে দক্ষিণ এশিয়ার মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয়, রিজার্ভের চাপ—সব একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। যুদ্ধ মানে কেবল সামরিক ক্ষয়ক্ষতি নয়; যুদ্ধ মানে খাদ্যদাম থেকে শুরু করে চাকরি-বাণিজ্য—সবখানে চেইন রিঅ্যাকশন।
এখানে দায়িত্বশীলতার পরীক্ষা দুই পক্ষেরই। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই “কিছু হোক চাই না” অবস্থানে থাকে, তবে তাকে প্রকাশ্য হুমকির ভাষা কমিয়ে স্পষ্ট করতে হবে—কোন আচরণে কী প্রতিক্রিয়া হবে, আর কোন পথে ডি-এসক্যালেশন সম্ভব। আর ইরান যদি সার্বভৌমত্ব রক্ষার বার্তা দিতে চায়, তবে যুদ্ধকে ‘অটোমেটিক’ বানিয়ে না তুলে এমন কাঠামো দেখাতে হবে যাতে ছোট ঘটনার পরও নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে—অর্থাৎ প্রতিশোধের নীতি থাকবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নীতিও থাকবে। কারণ সংঘাতের ইতিহাস বলে, মুখরক্ষার তাড়না যখন সামরিক সিদ্ধান্তকে চালায়, তখন কূটনীতি পেছনে পড়ে যায়—এবং ঠিক তখনই দুর্ঘটনা নীতিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বাস্তববাদী অবস্থান হলো—শান্তি ও সংলাপকে সমর্থন করা, যে কোনও ধরনের সামরিক উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানানো, এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় প্রস্তুতি রাখা। কারণ আমরা যুদ্ধের অংশীদার নই, কিন্তু যুদ্ধের মূল্য আমাদের বাজারে ঠিকই এসে পড়ে।
শেষ কথা, নৌবহরের গর্জন যত বড়ই হোক—যুদ্ধ শুরু হলে তা কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এখন সবচেয়ে প্রয়োজন শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন যোগাযোগের চ্যানেল—হটলাইন, মধ্যস্থতা, এবং কৌশলগত সংযম। এই অঞ্চলে শান্তি মানে কারও “হার” নয়; শান্তি মানে কোটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের বেঁচে থাকা।
২৫ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা





