
বিবিসি অবলম্বনে মুখপাত্র ডেস্ক
বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে আবার জাতীয় দলে ফেরানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যে বক্তব্য দিয়েছে, সেটার পর থেকেই ক্রিকেট অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি দলের বাইরে—এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে তাঁকে নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হওয়ায় অনেকে বিস্মিত। বিশেষ করে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্টের পর সাকিব আর বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামতে পারেননি—এই বাস্তবতা আবার আলোচনায় এসেছে।
বিসিবির বক্তব্য কী?
বৃহস্পতিবার দীর্ঘ একটি সভা শেষে রাতের সংবাদ সম্মেলনে বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান আমজাদ হোসেন জানান, সাকিবের ফিটনেস, এভেইলেবিলিটি এবং সংশ্লিষ্ট ভেন্যুতে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা থাকলে ভবিষ্যতে তাঁকে দলে নেওয়ার বিষয়টি বোর্ড ও নির্বাচক প্যানেল বিবেচনা করবে। তিনি আরও বলেন, সাকিব নিজেও জাতীয় দলে ফেরার আগ্রহের কথা বোর্ডকে জানিয়েছেন এবং হোম-অ্যাওয়ে—দুই ধরনের সিরিজে খেলতে প্রস্তুত থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
তবে বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সিদ্ধান্তটি পরিস্থিতি, সময়সূচি ও ভেন্যুর সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হবে—শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বাস্তবতা ও নির্বাচকদের মূল্যায়নের ওপর।
রাজনৈতিক প্রসঙ্গ কেন সামনে?
সাকিবকে না ডাকার পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিল—এমন আলোচনা আগেও ছিল। সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিভিন্ন বক্তব্য ও সাকিবের নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে সংবাদে উল্লেখ আছে।
সাকিব ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিতর্কিত নির্বাচনে মাগুরা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন থেকেই তাঁকে ঘিরে সমালোচনা শুরু হয়—একজন “রানিং ক্রিকেটার” সংসদ সদস্যের দায়িত্ব এবং ক্রিকেট—দুই দিক সামলাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় কানাডায় থাকা এবং সেই সময় তাঁর স্ত্রী উম্মে আল হাসান শিশিরের একটি পোস্ট ঘিরেও ক্ষোভ তৈরি হয়, যা সাকিব-বিরোধী মনোভাবকে আরও বাড়িয়েছে বলে বিবরণে এসেছে।
এছাড়া অভ্যুত্থানের পর তাঁর নাম হত্যামামলায় জড়িয়েছে, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার কথাও এসেছে। এসব বিতর্ক তাঁর ক্যারিয়ারের নানা সময়েই ছিল—মাঠে ও মাঠের বাইরে।
দেশে ফেরা, অবসর ঘোষণা এবং নতুন জটিলতা
সংবাদে বলা হয়েছে, সরকার পতনের পরও সাকিব পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে বিদেশের মাটিতে দলে ছিলেন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের সময়। মিরপুর টেস্ট দিয়ে অবসরের ঘোষণা দিলেও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক ও বিক্ষোভের কারণে তিনি দেশে ফেরেননি। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, দেশে ফিরলে জনরোষের শিকার হলে সরকারের কিছু করার থাকবে না। পরে দুবাই হয়ে ঢাকায় ফেরার পথে অনুমতি না পাওয়ায় মাঝপথ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে হয় তাঁকে—এমন কথাও প্রতিবেদনে আছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কি কেটেছে?
বিসিবি জানিয়েছে, সাকিবকে দল নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় আবারও বিবেচনা করা হবে—জাতীয় দলে ফেরার দরজা খোলা, এমনকি কেন্দ্রীয় চুক্তির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে—সাকিবের ফেরাকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।
আমজাদ হোসেন বলেছেন, সাকিবের রাজনৈতিক বিষয় সরকার দেখবে—এটি বিসিবির এখতিয়ার নয়। তবে সরকার না চাইলে কী হবে—এ বিষয়ে বিসিবি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। বিসিবির পরিচালক আসিফ আকবর বলেছেন, বিষয়টি সরকার সম্মতি দিলে সমস্যা নেই, কিন্তু ভবিষ্যতে সরকার বদলালে অবস্থান বদলাতে পারে—সেক্ষেত্রে বিসিবির করার কিছু থাকবে না।
এখানে আরেকটি বিষয়ও উঠে এসেছে—কয়েক মাস আগেও আসিফ আকবরের বক্তব্য ভিন্ন ছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, সাকিব অনুশোচনা করলে/ক্ষমা চাইলে ফিরতে পারেন—অথবা অনুশোচনা না থাকলে তাঁর ফেরার সম্ভাবনা দেখেন না। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁর এমন বক্তব্যও উদ্ধৃত হয়েছে যে, সাকিব অনুশোচনাহীন থাকলে তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলার সম্ভাবনা দেখেন না।
বিসিবি কি ‘পাবলিসিটি স্টান্ট’ করছে?
এই পুরো পরিস্থিতিতে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন—বিসিবি নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতেই সাকিব ইস্যু সামনে এনেছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ক্রীড়া বিভাগের প্রধান আরিফুল ইসলাম রনি বলেছেন, বিসিবি স্মরণকালের নাজুক অবস্থায় আছে। ক্রিকেটীয় কূটনীতিতে পিছিয়ে পড়া, আইসিসির ভোটাভুটিতে হার—এসবের পর তারা সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথা বলেছে এবং আইনি লড়াইয়ে না যাওয়ার কথাও জানিয়েছে। এমন সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড ও “সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার”কে সামনে আনা বিসিবির পরিকল্পিত পদক্ষেপ—এমন ধারণা থেকে একে ‘পাবলিসিটি স্টান্ট’ বলেও কেউ কেউ দেখছেন।
ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিক মাঝহারুল ইসলামও বলেছেন, কিছুদিন আগেই সংবাদ সম্মেলনে সাকিবের নাম উঠলে বিসিবি প্রশ্ন এড়িয়ে যেত, আর এখন নিজেরাই সাকিব ইস্যু টেনে আনছে—এটাই রহস্যজনক। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন—২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দর্শকরা মাঠে সাকিবের নাম লেখা ব্যানার/প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঢুকতে পারেননি। প্রশাসন-পুলিশ বাধা দিয়েছে, আর প্রশ্ন করলে উত্তর এসেছে বিসিবির দিক থেকেই—এমন কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে।
অবসরে যেতে চাওয়া ক্রিকেটারকে কেন্দ্রীয় চুক্তি—প্রশ্ন থেকেই যায়
আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো—সাকিব নিজেই সম্প্রতি এক পডকাস্টে বলেছেন, তিনি তিন ফরম্যাটে আর একটি সিরিজ খেলে অবসরে যেতে চান। তাহলে অবসরে যেতে চাওয়া একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে কেন কেন্দ্রীয় চুক্তির কথা উঠছে—এ প্রশ্নও তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, বিসিবির ঘোষণায় সাকিবের জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলেও—ফিটনেস, এভেইলেবিলিটি, ভেন্যু, নির্বাচকদের মূল্যায়ন—এইসব শর্তের পাশাপাশি রাজনীতি ও বিতর্কের ধোঁয়াশা পুরো আলোচনাটিকে এখনও অনিশ্চিত করে রেখেছে।





