ভোটের মাঠে টাকার লাগাম

Date:

spot_img

নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় একটি মৌলিক প্রশ্নে—ভোটার সিদ্ধান্ত নেবেন তথ্য ও বিবেচনায়, নাকি প্রভাব ও লোভের চাপে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রার্থীদের হলফনামা-ভিত্তিক যে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে, তা এই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে আনে। টিআইবির অনুসন্ধানে অন্তত ছয়জন প্রার্থীর ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ও বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ এসেছে; দুইজনের দ্বৈত নাগরিকত্বের নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা সত্ত্বেও তা হলফনামায় নেই, এবং চারজন বিদেশি সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে টিআইবি বলেছে। এই পর্যবেক্ষণকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই, কারণ নির্বাচনী ব্যয়, প্রভাব ও টাকার ভূমিকার সঙ্গে হলফনামার স্বচ্ছতা সরাসরি জড়িত।

হলফনামা ভোটারের কাছে প্রার্থীর অর্থনৈতিক ও আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করার নথি। এর লক্ষ্য কেবল সম্পদের তালিকা দেওয়া নয়; বরং প্রার্থীর দায়-দায়িত্বের সঙ্গে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, আয়ের উৎসের সঙ্গততা, এবং রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে তাঁর অবস্থান কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারে—সেই ধারণাটিও ভোটারকে দেওয়া। টিআইবি যে বলেছে, তথ্য গোপন থাকার পরও মনোনয়ন বৈধ হয়েছে, সেটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ এতে প্রশ্ন ওঠে—যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কি ন্যূনতম সত্যতা যাচাই নিশ্চিত করতে পারছে, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। একজন প্রার্থী বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাট থাকার কথা হলফনামায় জানিয়েও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে—এমন ইঙ্গিত রয়েছে; বিদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণও টিআইবি আনুমানিকভাবে উল্লেখ করেছে। আরেকজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে বিদেশে নিজস্ব মালিকানাধীন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য গোপনের কথা বলা হয়েছে। একজন প্রার্থীর নির্ভরশীলের নামে যুক্তরাজ্যে বড় অঙ্কের সম্পদ অর্জনের তথ্য, শেল কোম্পানির মাধ্যমে মালিকানা আড়াল, এবং কোম্পানির নিবন্ধন অন্য দেশে—এসব ইঙ্গিতও প্রতিবেদনে এসেছে। আবার একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে স্ত্রীর নামে বিদেশে সম্পদ থাকা, এবং একজনের ক্ষেত্রে করস্বর্গখ্যাত দেশে কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য গোপনের প্রসঙ্গ রয়েছে। এসব পর্যবেক্ষণের সারকথা একটাই: সম্পদ ও নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত তথ্যের পরিপূর্ণতা ও সত্যতা নিশ্চিত না হলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় টাকার ভূমিকা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

এখানে ‘ভোটের মাঠে টাকার লাগাম’ কথাটি কেবল নির্বাচনী প্রচারণায় নগদ অর্থ ছড়ানো বা ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করার প্রসঙ্গে সীমিত নয়। প্রার্থীর ঘোষিত সম্পদ যদি অসম্পূর্ণ থাকে, তবে নির্বাচনী ব্যয়ের উৎস ও সক্ষমতা সম্পর্কে ভোটার অন্ধকারে থাকেন। আর তথ্যের এই অস্বচ্ছতা শেষ পর্যন্ত টাকার প্রভাবকে আরও অনিয়ন্ত্রিত করে—যেখানে ব্যয় হয়, কিন্তু জবাবদিহি তৈরি হয় না।

তাই এই পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের করণীয় নিয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলা জরুরি। প্রথমত, হলফনামা যাচাইকে ঝুঁকিভিত্তিক ও প্রমাণনির্ভর করতে হবে—বিশেষ করে বিদেশি সম্পদ, বিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশে নিবন্ধিত কোম্পানি এবং নাগরিকত্বের মতো বিষয়ে। দ্বিতীয়ত, টিআইবি যে অনিয়মের সম্ভাব্য তথ্য-সংকেত দিয়েছে, সেগুলোকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করে দ্রুত যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া দরকার; যথাযথ প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, মিথ্যা তথ্য বা তথ্য গোপনের অভিযোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ হলে প্রতিরোধমূলক প্রভাব নষ্ট হয়ে যায়। দ্রুততা এখানে ন্যায়বিচারের শর্ত—একই সঙ্গে নির্বাচনী আস্থা রক্ষার শর্তও।

রাজনৈতিক দলগুলোর দায়ও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মনোনয়ন দেওয়ার আগে প্রার্থীর হলফনামা-তথ্য, নাগরিকত্ব-অবস্থা, সম্পদ-ঘোষণার পূর্ণতা—এসব যাচাই করা দলীয় ন্যূনতম শৃঙ্খলার অংশ হওয়া উচিত। দলীয় পর্যায়ে এই শৃঙ্খলা না থাকলে নির্বাচন কমিশনের একক তৎপরতা দিয়ে ‘টাকার লাগাম’ টানা বাস্তবে কঠিন হয়ে ওঠে।

টিআইবির প্রতিবেদনে আরেকটি বার্তা নীরবে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ—স্বচ্ছতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা না হলে ‘নিয়ম’ লেখা থাকে, প্রয়োগ দুর্বল হয়। হলফনামা ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে কেবল শাস্তির কথা বললে চলবে না; যাচাই সক্ষমতা, আন্তঃসংস্থাগত তথ্যসমন্বয়, এবং নির্বাচনকালীন অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে আরও দৃশ্যমান ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে। একই সঙ্গে প্রার্থীর সম্পদ ও নাগরিকত্বের তথ্য জনসাধারণের জন্য সহজে যাচাইযোগ্যভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগও প্রয়োজন, যাতে নাগরিক নজরদারি শক্তিশালী হয়।

শেষ পর্যন্ত নির্বাচন তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন প্রতিযোগিতার ভিত্তি থাকে জনসমর্থন, নীতি ও যোগ্যতা—অস্বচ্ছ সম্পদ ও অঘোষিত সুবিধা নয়। টিআইবি যে প্রশ্নগুলো তুলেছে, সেগুলোকে ‘অভিযোগ’ হিসেবে ফেলে না রেখে ‘সংস্কার ও প্রয়োগের’ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ ভোটের মাঠে টাকার লাগাম মানে কেবল অপব্যয় ঠেকানো নয়; মানে জনগণের রায়কে অনির্ভরযোগ্য প্রভাব থেকে মুক্ত করা—এবং সেই রায়ের ভিত্তিকে তথ্যের স্বচ্ছতায় দৃঢ় করা।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...