
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন বিতর্কিত ও নিষিদ্ধ অবস্থানে থাকা ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী এবার প্রথমবারের মতো ক্ষমতার খুব কাছাকাছি—এমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক জনমত জরিপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে নতুন রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে জামায়াত নিজেদের সংগঠন পুনর্গঠন করেছে এবং ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নেতৃত্বমূলক ভূমিকায় ওঠার মতো শক্তি সঞ্চয় করেছে।
ফরিদপুরের এক ব্যাংকার আবদুর রাজ্জাকের মতো অনেক সমর্থক এখন প্রকাশ্যে বলছেন—তাদের দল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট পেয়ে জোট সরকার গঠনে নেতৃত্ব দিতে পারে। মাঠপর্যায়ের এমন আত্মবিশ্বাসের পেছনে আছে জরিপের হিসাবও। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI)–এর ডিসেম্বর জরিপে বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ, জামায়াত ২৯ শতাংশ। আর জানুয়ারির আরেক জরিপে—বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থা (NarratiV, Projection BD, IILD, Jagoron Foundation) পরিচালিত—বিএনপি ৩৪.৭ শতাংশ ও জামায়াত ৩৩.৬ শতাংশ সমর্থনের কথা উঠে এসেছে। ফলে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপি বনাম জামায়াত—দুই মেরুর প্রতিযোগিতার কথাও জোরালো হচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন—যা ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় ভোট। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে ক্ষমতার পালাবদলের পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন আকার পেয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে জামায়াত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP)–সহ কয়েকটি দলের সঙ্গে নির্বাচনমুখী জোট গড়েছে। এনসিপি গঠিত হয়েছে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে। জামায়াতের লক্ষ্য—বিএনপির দীর্ঘদিনের “জোটসঙ্গী” পরিচয় থেকে বেরিয়ে এবার জোট নেতৃত্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা।
জামায়াতের উত্থান নতুন নয়, কিন্তু প্রেক্ষাপট ব্যতিক্রমী। দলটি ১৯৪১ সালে ইসলামি চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী–র নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দলটি নিষিদ্ধ হয়। পরে ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে দলটি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। ১৯৯১ ও ২০০১–২০০৬ সময়কালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে জামায়াত প্রভাবও বিস্তার করে এবং একপর্যায়ে মন্ত্রিসভায়ও যায়।
তবে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফেরার পর যুদ্ধাপরাধ বিচারের মাধ্যমে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের পর একাধিক নেতা ফাঁসিতে ঝুলেছেন, দলটি নিষিদ্ধ হয়েছে এবং দীর্ঘ ১৫ বছর জামায়াত কার্যত রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ছিল। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর কারামুক্ত শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বে জামায়াত পুনর্গঠিত হয়ে মাঠে নেমেছে। বর্তমানে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন আমির ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তবে জামায়াতের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগও বাড়ছে—বাংলাদেশ কি ইসলামপন্থি নেতৃত্বকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে প্রস্তুত? সমালোচকদের আশঙ্কা, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরিয়াভিত্তিক কড়াকড়ি, নারী অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে জামায়াত নেতারা তা নাকচ করে বলেছেন, তারা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই শাসন চালাবেন এবং সংস্কার, সুশাসন ও দুর্নীতিদমনকে অগ্রাধিকার দেবেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বিশ্লেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশের সমাজে ধর্মীয় অনুরাগ বাড়লেও ভোটাররা অনেক ক্ষেত্রে “রাজনৈতিকভাবে বাস্তববাদী”—তারা ধর্মাচরণ আর রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্বকে এক করে দেখেন না। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের পরামর্শক থমাস কিয়ানও ইঙ্গিত দিয়েছেন, জামায়াতের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাদের “শৃঙ্খলাবদ্ধ ও তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন” সংগঠনিক ভাবমূর্তি—বিশেষ করে দুই প্রধান দল নিয়ে জনগণের হতাশার সময়ে। তবে একই সঙ্গে তাদের অতীত ইতিহাস ও কিছু নীতিগত অবস্থান অনেক ভোটারের কাছে বাধা হয়ে থাকবে বলেও মত দিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু কে জিতবে তার লড়াই নয়—এটি হবে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক সংস্কার এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় ধরনের জনমতের পরীক্ষা। জামায়াত ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাবে কি না—তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে ব্যালট বাক্স কিন্তু আল জাজিরার ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রথম দলটি বাস্তব অর্থে ক্ষমতাসীন জোটের নেতা হওয়ার “বাস্তব সম্ভাবনা” নিয়ে নির্বাচনে নামছে।





