
দেশজুড়ে ৬০ প্রকল্প, মানচিত্রে ১,৪৯৮ সম্ভাবনাময় গন্তব্য
বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের পর্যটন খাতকে নতুন উচ্চতায় নিতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার বড় পরিকল্পনা সামনে এনেছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। দেশজুড়ে ৬০টি পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রস্তাব করা হয়েছে ১৯ হাজার ৯০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনায় চিহ্নিত করা হয়েছে দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি সম্ভাবনাময় পর্যটন আকর্ষণ। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সিলেট এবং উপকূলীয় দ্বীপ থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত পর্যটনের নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যটন কমপ্লেক্স, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, পরিবেশবান্ধব পর্যটন সুবিধা, বিনোদনকেন্দ্র, কেবল কার, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র এবং প্রশিক্ষণ অবকাঠামো। পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র তৈরি নয়, বিদ্যমান সম্ভাবনাময় স্থানগুলোর অবকাঠামো ও পর্যটকসেবার মানও উন্নত করা।
পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামীমুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ৬০টি প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। মন্ত্রণালয় পরে প্রস্তাবগুলো পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। ফলে প্রকল্পগুলো এখনো অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে। এ অঞ্চলের নয়টি প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কক্সবাজারের প্রবাল দ্বীপ এলাকা, পতেঙ্গা, সাবরাং ও অন্যান্য পর্যটন এলাকায় নতুন সুবিধা তৈরির পাশাপাশি পর্যটকদের অবস্থান দীর্ঘায়িত করতে বিনোদন ও বৈচিত্র্যময় পর্যটন কার্যক্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই, বান্দরবান ও রাঙামাটিতেও নতুন পর্যটন সুবিধা তৈরি এবং বিদ্যমান আকর্ষণগুলো সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। ঝুলন্ত সেতুসহ পরিচিত পর্যটন স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠন ও উন্নয়নও পরিকল্পনার অংশ।
উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলের পর্যটন উন্নয়নে প্রস্তাব করা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। বরগুনার তালতলী, রাঙ্গাবালী, চর বিজয়, আমতলী, কুয়াকাটা, হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ ও মনপুরার মতো সম্ভাবনাময় এলাকায় আবাসন ও পর্যটকসেবা অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিলেট অঞ্চলে ১২টি প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা ও পর্যটন কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনার পাশাপাশি বৃহত্তর ময়মনসিংহের শেরপুর, দুর্গাপুর, জামালপুর ও নালিতাবাড়ীর সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাও মহাপরিকল্পনার আওতায় এসেছে।
সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের উন্নয়নে খুলনা অঞ্চলে চারটি প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৭২০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। খুলনা ও বাগেরহাটে উন্নতমানের আবাসন, পাঁচ তারকা হোটেল এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। উত্তরাঞ্চল ও রাজশাহী বিভাগের পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও সাতটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঢাকা ও আশপাশের পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নেও প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে বহুমুখী পর্যটন কমপ্লেক্স, হস্তশিল্প কেন্দ্র, ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন আকর্ষণ এবং হাতিরঝিলে কেবল কার স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।
তবে পুরো অর্থ সরকারের কোষাগার থেকে ব্যয় করার পরিকল্পনা নেই। পর্যটন করপোরেশন জানিয়েছে, প্রকল্পভেদে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বড় প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগও রাখা হবে। অর্থায়নের ধরন প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমানে পর্যটন করপোরেশনের অধীনে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, পিকনিক স্পট ও পর্যটন তথ্যকেন্দ্রসহ ৫৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর অনেকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সরকারি অর্থের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজারের প্রায় ১৩২ একর সরকারি জমিতে হোটেল শৈবালকে আন্তর্জাতিক মানের সমন্বিত পর্যটন কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ এ ধরনের অংশীদারিত্বের বড় উদাহরণ।
জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনায় দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকার বলছে, বিচ্ছিন্ন পর্যটন সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপ দেওয়াই এই মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য। পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, হস্তশিল্প, পরিবহন ও সেবা খাতকে যুক্ত করার সুযোগও তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত ৬০ প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে গেলে বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে শুধু পরিচিত কয়েকটি গন্তব্যের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। দেশের পাহাড়, সমুদ্র, বন, হাওর, নদী, দ্বীপ ও ঐতিহাসিক জনপদকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সেই সম্ভাবনাই পর্যটন খাতে ১৯ হাজার কোটি টাকার এই পরিকল্পনাকে নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে।





