ভালো মানুষ এখনও আছে

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

দৈনন্দিন জীবনে আমরা যতই ব্যস্ত থাকি, রাস্তার পাশে থেমে থাকা একটি গাড়ি, ধোঁয়া ওঠা একটি ইঞ্জিন কিংবা কারও আতঙ্কিত চিৎকার—এসব দৃশ্য অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। কখনও ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাই। কারণ থামলে ঝামেলা হতে পারে, সময় নষ্ট হবে, বিপদও হতে পারে—এই ভাবনা আমাদের দায়িত্বকে কেটে ফেলে নিরাপদ দূরত্ব-এ দাঁড় করায়। অথচ মানবতার আসল পরীক্ষা হয় ঠিক ওই মুহূর্তেই—থামব কি থামব না?

বিবিসি ওয়েলস-এর এক প্রতিবেদনে (এলেরি গ্রিফিথস ও এমিলিয়া বেলি) উঠে এসেছে এমনই এক ঘটনা। ওয়েলসের ব্লেনাউ গুইন্ট অঞ্চলের এব্বু ভেল-এর ২১ বছর বয়সী মা অ্যালেক্স ম্যাকক্লিন তাঁর ৯ মাসের শিশুকন্যা লাইলাহকে নিয়ে যাচ্ছিলেন প্লেগ্রুপে। পথে হঠাৎ গাড়ির শক্তি কমে আসে, সতর্কবার্তা জ্বলে ওঠে, তিনি রাস্তার পাশে গাড়ি থামান—কিন্তু মুহূর্তেই গাড়ির ভেতর ধোঁয়া ঢুকে পড়ে। অ্যালেক্স বেরিয়ে আসতে পারলেও তাঁর শিশুকে বের করতে পারেননি। পেছনের ও যাত্রীপাশের দরজা খুলছিল না। আতঙ্কে তিনি অন্য পাশের দরজা চেষ্টা করাও ভুলে যান। গাড়ির বনেট রঙ বদলাতে থাকে—আগুনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি চিৎকার করেন, সাহায্য চান, অনেক গাড়ি পাশ কাটিয়ে চলে যায়।

এই “চলে যাওয়া”গুলোই সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা। আমরা অনেকে বিপদ দেখেও থামি না—কারও জীবন তখন ঝুলে থাকে কয়েক সেকেন্ডে, আর আমরা সেটাকে কারও সমস্যা বলে সরিয়ে দিই। কিন্তু সেই একই রাস্তায় ছিলেন ওয়েসলি বেইনন ও তাঁর চাচা মার্ক উইলডিং। তাঁরা থামলেন। ভয় সত্ত্বেও এগিয়ে গেলেন। ওয়েসলি ড্রাইভারের দিক দিয়ে ঢুকে শিশুর হারনেস খুললেন, আর মার্ক শিশুটিকে টেনে নিরাপদে বের করে আনলেন—যখন আগুন ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছিল। তাদের ভাষায়, ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের মধ্যেই পুরো গাড়ি আগুনে গ্রাস হয়। ওই কয়েকটি সেকেন্ডই একটি শিশুর জীবন আর একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছে।

এখানে নায়ক শব্দটি সহজেই ব্যবহার করা যায়। সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসাও এসেছে। ফোন রেড হট হয়ে উঠেছে—তবু ওয়েসলি বলছেন, তাঁরা প্রশংসার জন্য করেননি। “ইনস্টিংক্ট” কাজ করেছে। এই কথার গভীরে এক বড় সত্য আছে। মানবতা আসলে প্রদর্শন নয়—এটা স্বতঃস্ফূর্ত দায়িত্ববোধ। যে দায়িত্ববোধ আমাদের বলে, “এটা কারও একার বিপদ নয়, এটা আমাদের সবার।”

অ্যালেক্সের কৃতজ্ঞতাও আমাদের নাড়া দেয়। তিনি বলেছেন, লাইলাহ বড় হয়ে জানবে—কারা তাকে বাঁচিয়েছিল। কৃতজ্ঞতা শুধু ধন্যবাদ নয়। কৃতজ্ঞতা হলো সমাজের জন্য এক ধরনের স্মারক—যেন আমরা ভুলে না যাই, ভালো মানুষ এখনও আছে এবং ভালো হওয়াটা এখনও সম্ভব।

তবে এই ঘটনার আরেকটি কঠিন প্রশ্নও আছে—যদি ওয়েসলি ও মার্ক না থামতেন? যদি সবাই পাশ কাটিয়ে চলে যেত? যেমন যায়। তখন একটু দেরি মানে হতে পারত চিরতরে হারিয়ে যাওয়া। তাই আমার এই লেখা শুধু প্রশংসা নয়—একটি আহ্বানও। রাস্তার পাশে অসহায় কাউকে দেখলে থামুন। নিরাপত্তা বজায় রেখে, পরিস্থিতি বুঝে, জরুরি সেবা ডাকুন। সম্ভব হলে সাহায্য করুন। আপনার এক মিনিট কারও সারাজীবন হতে পারে।

আজকের পৃথিবীতে মানবতা অনেক সময় সংবাদ হয়—কারণ সেটা যেন বিরল হয়ে উঠছে। অথচ মানবতা বিরল নয়, হওয়া উচিত স্বাভাবিক। ওয়েলসের ওই রাস্তায় দুইজন মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন—স্বাভাবিক মানবতাই কখনও কখনও সবচেয়ে বড় বীরত্ব।

সূত্র : BBC Wales-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে (Eleri Griffiths & Emilia Belli), “Mum thanks strangers who rescued nine-month-old baby from burning car”

১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...