
রংপুর ব্যুরো
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তচিন্তার চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ে পার্বতীপুর উপজেলার খোলাহাটী ডিগ্রি কলেজে নানা আয়োজনে পালিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) কলেজ পরিবারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। নজরুলের সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত করে তোলা এবং তাঁর আদর্শকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানে কবির বিদ্রোহী চেতনার পাশাপাশি সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, স্বাধীন চিন্তা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দিকগুলো তুলে ধরা হয়। আয়োজনকে ঘিরে কলেজের শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা নজরুলের কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্মের ওপর ভিত্তি করে নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেয়। তাদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা উপস্থিত শিক্ষক ও অতিথিদের মুগ্ধ করে। সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি ছিলেন শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং মানবতার কবি। তাঁর লেখনীতে অন্যায়, অত্যাচার, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষে মানুষে সমতা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির আহ্বান। তাঁর সাহিত্য আজও সমাজের নানা অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সচেতন হতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। তারা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মকে সঠিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে নজরুলের সাহিত্য ও জীবনাদর্শের চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে তাদের চিন্তার জগৎ যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি গড়ে উঠবে মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে।
খোলাহাটী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মবিদুল ইসলাম বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও দর্শন আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে যে সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা রয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই হবে না, তাদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।তিনি আরও বলেন, নজরুলের চেতনা অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে তাঁর সাহিত্য মানুষকে ভালোবাসতে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজরুলের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষকরা বলেন, একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে নজরুলের আদর্শ তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশনা হতে পারে। তাঁর কবিতা ও গান শিক্ষার্থীদের শুধু বিনোদন দেয় না, বরং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা সৃষ্টি করে।অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরাও নজরুলের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজেদের আগ্রহের কথা তুলে ধরে। তাদের মতে, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে কবির জীবন, কর্ম ও আদর্শ সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা প্রকাশেরও সুযোগ পান তারা। কলেজ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। সম্মিলিত প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা ও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় প্রাণের এক মিলনমেলায়।
আয়োজকরা জানান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা, সম্প্রীতি, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটাতে নজরুলের সাহিত্য চর্চার কোনো বিকল্প নেই।
আয়োজকরা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, নজরুলের সাম্য ও মানবতার বাণী শিক্ষার্থীদের জীবনচর্চার অংশ হয়ে উঠবে। তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক আদর্শ সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।





