
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে কখনো ক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলে, কখনো আন্দোলনে এবং কখনো কঠিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে পথ চলেছে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তাৎপর্য অবশ্য অন্যবারের চেয়ে আলাদা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী। ফলে এবার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস স্মরণের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিশ্রুতির আয়নায় দাঁড়ানোর দিনও বিএনপির।
একটি রাজনৈতিক দলের ৪৮ বছরের পথচলা ছোট ঘটনা নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের বড় একটি অংশ বিএনপিকে বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব নয়। জিয়াউর রহমানের সময় দলটির জন্ম, তাঁর মৃত্যুর পর সংকট, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পুনর্গঠন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯১ সালে সরকার গঠন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন, আবার ক্ষমতা হারানো, পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা এবং তারপর দীর্ঘ বিরোধী অধ্যায়, সব মিলিয়ে বিএনপি এ দেশের রাজনৈতিক উত্থান পতনের সাক্ষী।
ইতিহাসের এই জায়গাটি স্বীকার করতে কার্পণ্য করার প্রয়োজন নেই। একইভাবে এটাও মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য স্থায়ী আমানত নয়। ইতিহাস সম্মান দিতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না।
বিএনপির আজকের সবচেয়ে বড় বাস্তবতাও এখানে।
দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকলে ক্ষমতাসীনদের ভুল দেখানো যায়। রাষ্ট্রের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, বেকারত্ব, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনের দলীয়করণ কিংবা নাগরিক অধিকারের সংকটের জন্য সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর সেই প্রশ্নগুলোই নিজের দিকে ফিরে আসে।
আজ বিএনপির সামনে সেই আয়না।
মানুষ বাজারে গিয়ে স্বস্তি পাচ্ছে কি না, তরুণ চাকরি পাচ্ছে কি না, বিনিয়োগকারী নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারছেন কি না, ব্যাংকের টাকা নিরাপদ কি না, ব্যবসায়ীকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে কি না, থানায় সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না, প্রশাসন রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে আইন মেনে চলছে কি না, এসব প্রশ্ন দিয়েই শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য বিচার হবে।
স্লোগান দিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।
বিএনপি নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কাগজ থেকে মানুষের জীবনে পৌঁছানোর পালা। ক্ষমতার প্রথম সময়ের জনপ্রিয়তা যত বড়ই হোক, মানুষের ধৈর্য অসীম নয়। বাংলাদেশের মানুষ বহু সরকার দেখেছে। তারা এখন প্রতিশ্রুতির ভাষার চেয়ে ফল দেখতে বেশি আগ্রহী।
ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
যে দল দীর্ঘ সময় বিরোধী অবস্থানে থেকে রাজনৈতিক অধিকার, সভা সমাবেশের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের সুযোগ এবং নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দাবি করেছে, সেই দল ক্ষমতায় এসে বিরোধীদের জন্য কতটা একই অধিকার নিশ্চিত করে, সেটিই তার গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের প্রকৃত পরীক্ষা।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নিজের কথা বলার স্বাধীনতায় নয়, প্রতিপক্ষের কথা বলার অধিকার রক্ষায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিশোধের চক্র বহু ক্ষতি করেছে। সরকার বদলেছে, সঙ্গে বদলেছে সুবিধাভোগী। মামলার আসামি বদলেছে, দখলদার বদলেছে, প্রভাবশালীর পরিচয় বদলেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেক ক্ষেত্রেই একই থেকেছে। বিএনপির সামনে সুযোগ এসেছে এই চক্র ভাঙার। দলীয় কর্মীর অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস সরকার দেখাতে পারলে সেটিই হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অতীতের ত্যাগ স্মরণ করা স্বাভাবিক। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবদান স্মরণ করবে দল। আন্দোলনে নিহত, আহত, কারাবরণকারী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের কথাও বলা হবে। সারাদেশে পতাকা উঠবে, আলোচনা হবে, কর্মসূচি পালিত হবে। পাঁচ দিনের কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে বিএনপি।
কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সবচেয়ে বড় কর্মসূচি হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে একটু সহজ করার অঙ্গীকার।
একজন নিম্ন আয়ের মানুষের বাজারের ব্যাগ যদি আগের চেয়ে ভারী করা যায়, একজন বেকার তরুণের হাতে যদি কাজ পৌঁছে দেওয়া যায়, একজন উদ্যোক্তার সামনে থেকে যদি হয়রানি সরানো যায়, একজন নাগরিক যদি রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যায়বিচার পান, তাহলে সেটিই হবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সবচেয়ে বড় উদযাপন।
৪৮ বছরের একটি দলের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও তাই ছোট হতে পারে না।
বিএনপি আজ আর শুধু আন্দোলনের দল নয়। তারা এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। অভিযোগ করার জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় এসেছে। দাবি জানানোর অবস্থান থেকে জবাব দেওয়ার অবস্থানে এসেছে।
এই পরিবর্তনটি যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে, দলটির জন্য ততই মঙ্গল। দেশের জন্যও।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপিকে আমাদের শুভেচ্ছা। একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ক্ষমতা কোনো রাজনৈতিক দলের পুরস্কার নয়। জনগণ ক্ষমতা দেয় দায়িত্ব পালনের জন্য। সেই দায়িত্বে সফল হলে ইতিহাস মানুষই লিখবে। ব্যর্থ হলে ইতিহাসও কাউকে রক্ষা করে না।
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে তাই সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত, ক্ষমতার আনন্দ নয়, ক্ষমতার দায়কে বড় করে দেখা।





