
ছাদেক হোছাইন, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
জীবনে অভাব-অনটন বা পারিবারিক প্রতিকূলতা কি স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে? চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার এলাকার এক সেলুনে ঢুকলে মনে হবে, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। সেখানে ট্রিমার আর কাঁচির শব্দের সাথে মিশে আছে কবিতার ছন্দ, আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় বইয়ের ঘ্রাণ। এটি কোনো সাধারণ সেলুন নয়, এটি ‘অদ্বৈত হেয়ার ড্রেসার’, যা একই সাথে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। আর এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের রূপকার হলেন প্রদীপ প্রোজ্জ্বল।
১৯৮৫ সালে কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট ডোমখালীতে জন্ম নেওয়া প্রদীপের শৈশব ছিল অভাব আর পারিবারিক জটিলতায় ভরা। মাত্র তিন বছর বয়সেই আপনজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি বড় হন মামা আর দিদিমার (নানির) আশ্রয়ে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নবম শ্রেণিতেই থমকে যায়। কিন্তু শেখার আকাঙ্ক্ষা তার কখনো কমেনি। মামা ছিলেন একজন পেশায় নরসুন্দর। মামার কাছে ক্ষৌরকর্ম বা নাপিতের কাজ শিখেছিলেন জীবিকার তাগিদে।
পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্তার কারণে লেখা পড়ায় ভালো হয়েও পড়ালেখা আর বেশিদূর এগোয়নি। জীবীকার তাগিদে কক্সবাজার থেকে ঢাকায় এসে ওয়ারীতে কয়েক বছর এই কাজ করেছেন প্রদীপ। একসময় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনেও (এফডিসি) কাজের সুযোগও পেয়েছিলেন। তার অনেক বন্ধু আজও সেখানে আছেন শিল্পী হিসেবে। কিন্তু প্রদীপ যাননি। কারণ, তার ওপর ছিল অনেকগুলো মানুষের দেখভালের দায়িত্ব। তবে মনে সুপ্ত ছিল সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো তিনিও যেন প্রথাগত বিদ্যালয়ের দেয়াল ভেঙে খুঁজে নিয়েছেন জ্ঞানের জগৎ।
সেলুন যখন বইয়ের রাজ্য
কিছুদিন পর প্রদীপ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরে যান । ২০১০ সালে চকবাজার আতুরার দোকান এলাকায় প্রদীপ প্রোজ্জ্বল চালু করেন তার স্বপ্নের সেলুন ‘অদ্বৈত হেয়ার ড্রেসার’। সেলুনের ভেতরটা সাজানো গোছানো। বড় আয়নার ঠিক উল্টো দিকে কাঠের বড় তাকজুড়ে শোভা পাচ্ছে হাজারেরও বেশি বই। যেখানে গ্রাহকেরা চুল কাটানোর ফাঁকে তাদের অপেক্ষার সময়টুকু বই পড়ে কাটাতে পারেন। সেলুনের এই শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে বইয়ের আধিক্য একে অনন্য করে তুলেছে।
প্রদীপ প্রথমে গ্রাহকদের বই পড়ে সময় কাটানোর জন্য তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বই দিতেন। ধীরে ধীরে এটি একটি মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এখন সেলুনের তাকে ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য, এমনকি শিশুতোষ বইও রয়েছে। স্থানীয় তরুণ ও শিক্ষার্থীরা একে এখন তাদের প্রিয় লাইব্রেরি হিসেবেই চেনে। স্থানীয় পাঠকরা মনে করছেন, জ্ঞানভিত্তিক ও সুরভিত পরিবেশ শৈশব থেকেই নতুন প্রজন্মের মাঝে বই পড়ার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলছে।
কাঁচির শব্দে কবিতার ছন্দ
প্রদীপ কেবল বই সংগ্রহই করেন না, তিনি নিজেও একজন নিবেদিত সাহিত্যিক। ক্ষুর-কাঁচি দিয়ে মানুষের অবয়ব পাল্টানোর পাশাপাশি তিনি মোবাইলে টুকে রাখেন তার কাব্যিক ভাবনাগুলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম,শামসুর রাহমান বা জীবনানন্দ দাশের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা থাকলেও, তিনি চান নিজস্ব একটি ঘরানা তৈরি করতে। নিজের পরিচয়ে তিনি বড় হতে চান। তাই তরুণদের বা সমসাময়িক কবিদের লেখাগুলো পড়তে ভালোবাসেন। জানাশোনার বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার কবিতাগুলো ইদানিং টানছে তাকে।তার এই সাহিত্য সাধনার ফলস্বরূপ ইতিমধ্যে ৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে কবিতা, উপন্যাস, গল্প এবং শিশুসাহিত্যও রয়েছে। ২০১৪ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল।
স্বপ্নের বিস্তার ও স্বীকৃতি
প্রদীপ প্রোজ্জ্বলের সাহিত্য অনুরাগের পরিচয় তার কর্মকাণ্ডেও পরিলক্ষিত হয়। তিনি নিয়মিত প্রোজ্জ্বল নামক ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন। ২০২৩ সালে তিনি প্রবর্তন করেছেন ‘প্রোজ্জ্বল পাঠাগার সাহিত্য পুরস্কার’, যার মাধ্যমে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট লেখকদের সম্মাননা জানানো হচ্ছে। তার এই পাঠাগারের ধারণা এখন আরও ছড়িয়ে পড়েছে। নাসিরাবাদে তার দ্বিতীয় সেলুনেও তিনি পাঠাগার গড়ে তুলেছেন। এমনকি তার নিজ গ্রামেও পাঠিয়েছেন অনেক বই। প্রদীপ জানান, তার সেলুনটি কেবল ব্যবসার জায়গা নয়, বরং প্রগতিশীল ও মার্জিত মানুষের মিলনমেলা। তিনি আরও জানান, পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক গ্রাহক হাতে সময় নিয়ে দুপুরের দিকে চলে আসেন। চুল কাটা, দাড়ি কামানোর পরও অনেকে বসে থাকেন হাতের বই শেষ করার জন্য। গ্রাহকের বাইরেও অনেকে বইয়ের লোভে চলে আসেন প্রদীপের সেলুনে। তিনি বলেন, ‘আশপাশের কিছু স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছেলেরা আসে। নিজের পছন্দমতো কোনো বই নিয়ে কিছুটা সময় পড়ে, আবার চলে যায়। এরা শুধু বই পড়তে আসে। এমনও কেউ কেউ আছেন, যারা ছোট ছোট বাচ্চাকে নিয়ে আসেন,বইয়ের সাথে অভ্যাস করানোর জন্য।
অনুপ্রেরণার এক নাম
ছোটোবেলা থেকেই বেশ সাহসী এবং স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন তিনি। নিজের অপ্রাপ্তিগুলোর জন্য কখনো দমে যাননি। জীবনের রুক্ষ বাস্তবতায় যে প্রদীপ প্রোজ্জ্বলকে শৈশবে আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছিল, বই আর সাহিত্যকে আপন করে তিনি আজ শত শত মানুষের অনুপ্রেরণা। তার জীবন প্রমাণ করে যে, পেশা যা-ই হোক, হৃদয়ে যদি শিল্পের বাস থাকে, তবে প্রতিকূলতার বালুচরেও স্বপ্নের ফুল ফোটানো সম্ভব। এক সাধারণ সেলুনও হয়ে উঠতে পারে জ্ঞানের এক অনন্য বাতিঘর।





